নদী খনন কাগজে, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বাস্তবে, বিআইডব্লিউটিএর মাফিয়া ছাইদুর!

বিআইডব্লিউটিএতে এখনো ‘মাফিয়া’ হয়ে রাজত্ব করছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ছাইদুর রহমান। অথচ স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা। এই পরিচয় ও পদবি ব্যবহার করে নদী খনন প্রকল্পে অনিয়ম, দরপত্র ও বদলি বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে আলোচিত হলেও এসব বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে, ড্রেজিং বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে ভোগাই ও কংস নদ খনন প্রকল্পে ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব যাচাইয়ের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছ থেকে দায়মুক্তি নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে ছাইদুর রহমান প্রকল্পের কাজ, দরপত্র ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দাবি করেন, এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে হয়রানি ও কর্মক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
নদী খনন না করেই ১৩৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
ভোগাই ও কংস নদ খনন প্রকল্পে ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগটি ছাইদুর রহমানকে ঘিরে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি। অভিযোগ অনুযায়ী, নেত্রকোনার ভোগাই ও কংস নদ এবং সংশ্লিষ্ট নৌপথের প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার খননের জন্য নেওয়া প্রকল্পে কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে নির্ধারিত পরিমাণে খনন হয়নি। অথচ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পের বিল পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের আওতায় ভোগাই ও কংস নদ খননের কাজ নেওয়া হয়। প্রকল্পের অধীনে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অংশে কাজ করে। নদী থেকে প্রায় এক কোটি ঘনমিটার বালু উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, দরপত্রে ড্রেজার, এস্কেভেটর ও অন্যান্য পদ্ধতিতে খননের শর্ত থাকলেও নির্ধারিত কাজের সব অংশ বাস্তবে সম্পন্ন হওয়ার পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোথাও কোথাও খননের পরিবর্তে নদীর তলদেশে পলি জমার চিত্রও উঠে এসেছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এসব অনিয়মের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে প্রকল্পের নথি, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব অবস্থা মিলিয়ে দেখা জরুরি।
এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছিল। অনুসন্ধানে প্রকল্পের নথিপত্র সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং খননকাজের পরিমাণ যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগসংক্রান্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
সম্পদের হিসাব তলব, যাচাই নিয়ে প্রশ্ন
ছাইদুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী শামীমা আক্তারের সম্পদের হিসাব চেয়ে ২০২০ সালের নভেম্বরে দুদকের নোটিশ জারির তথ্যও সামনে এসেছে। একই সময়ে বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার সম্পদের হিসাবও চাওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথির বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
দুদক আইনের ২৬ ধারার ক্ষমতাবলে জারি করা ওই নোটিশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজের ও নির্ভরশীল ব্যক্তিদের নামে এবং বেনামে অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, দায়দেনা ও আয়ের উৎসের বিস্তারিত বিবরণী জমা দিতে বলা হয়েছিল।
অভিযোগকারীদের দাবি, সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে যাচাই কার্যক্রম শেষ হয়নি। তবে ২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই প্রকৌশলীকে দায়মুক্তি দেয়। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-১) মো. কামরুজ্জামান স্বাক্ষরিত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের এক দাপ্তরিক পত্রে (স্মারক নম্বর: ০০.০১.০০০০.০০০.৫০১.০১.০০৩৭.১৭.১৫) এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। পত্রে উল্লেখ করা হয়, আনীত অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রমাণিত না হওয়ায় কমিশন অভিযোগটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করেছে।
ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের সম্পদের কিছু অংশ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বলে দাবি করেছেন। এমনকি তাঁর বাবার জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁকে মৃত দেখিয়ে সম্পদের মালিকানা দাবি করার অভিযোগও উঠেছে।
ফ্ল্যাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের নামে সম্পদের অভিযোগ
ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট এবং কুড়িগ্রামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় তাঁর একটি ফ্ল্যাট এবং খিলগাঁওয়ের একটি আবাসিক ভবনে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাট রয়েছে। কুড়িগ্রাম শহরে রড-সিমেন্টের একটি বড় দোকান এবং তাঁর ভাইয়ের নামে একটি ইটভাটার মালিকানা বা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তোলা হয়েছে। এ ছাড়া অফিসের কাজে ও পরিবারের যাতায়াতের জন্য একাধিক গাড়ি ব্যবহার এবং বিভিন্ন প্রকল্পের গাড়ি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
চাকরিতে যোগদান ও সনদ নিয়ে অভিযোগ
ছাইদুর রহমানের চাকরিজীবন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, তিনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) কর্মরত থাকার সময় চাকরি হারিয়েছিলেন এবং পরে তথ্য গোপন করে ২০০৩ সালে বিআইডব্লিউটিএতে যোগ দেন। তাঁর শিক্ষাগত সনদ নিয়েও জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।
দরপত্র ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে দরপত্র, নিয়োগ ও বদলিকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ করেছেন সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, প্রকল্পের কাজে অনিয়মের বিষয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তাঁকে হয়রানি ও নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়।
জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে?
বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং প্রকল্পের অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হয়। নদীপথ সচল রাখা, নৌপরিবহন সহজ করা এবং নদীভাঙন ও নাব্যতা-সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলায় এসব প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ বা কাজ না করে বিল নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, জনস্বার্থেরও গুরুতর ক্ষতি।
ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সম্পদের উৎস যাচাই এবং প্রকল্পের বাস্তব কাজ পরিমাপ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি যে পদেই থাকুন না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের প্রমাণ না মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তিও স্বচ্ছভাবে জানানো উচিত।
এ বিষয়ে ছাইদুর রহমানের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু তিনি ফোনে সাড়া দেননি।