সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য হলেও ঢাকা পরিচ্ছন্ন রাখুন: প্রধানমন্ত্রী শুষ্ক মৌসুমে আগুনের ঝুঁকি, ফায়ার সার্ভিসের ১৩ নির্দেশনা অনলাইনে ব্যবসার লাইসেন্স, মেয়াদ বাড়ছে ৩ থেকে ৫ বছর: বাণিজ্যমন্ত্রী দেশে হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ছাড়াল ১২০০ প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৪৮৪, মিরপুরেই ১৫০ সাতক্ষীরায় শামীম হত্যা: আদালতে স্বীকারোক্তি দিলেন আমিনী বাংলাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা হচ্ছে: দীনেশ ত্রিবেদী মজুরি বোর্ড ঘিরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি গার্মেন্টস নেতাদের শুধু শোক নয়, পাটুয়ারটেকের অগ্নিকাণ্ডে চাই বিচার ও জবাবদিহি
  • শুধু শোক নয়, পাটুয়ারটেকের অগ্নিকাণ্ডে চাই বিচার ও জবাবদিহি

    শুধু শোক নয়, পাটুয়ারটেকের অগ্নিকাণ্ডে চাই বিচার ও জবাবদিহি
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু হতে পারে না। অথচ পর্যটনকেন্দ্রের একটি রিসোর্টে আগুনে পুড়ে ১০ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল, নিরাপত্তাব্যবস্থায় অবহেলা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে টুপটুপ রিসোর্টে ঘটে যাওয়া এই অগ্নিকাণ্ড শুধু কয়েকটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয়নি, আমাদের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশাসনিক তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

    আগুনে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ শনাক্তের অপেক্ষায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে স্বজনদের আহাজারি যে কারও হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করবে। কেউ হারিয়েছেন স্ত্রীকে, কেউ ভাই-ভাবিকে, কেউবা পরিবারের নিষ্পাপ শিশুসন্তানদের। প্রিয়জনের মরদেহটুকু বুঝে নেওয়ার জন্যও তাঁদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা থাকলে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। তবে স্বজনদের অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণা কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত পরীক্ষার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা এবং পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা দেওয়া।

    কিন্তু এই শোকাবহ ঘটনার পর আমাদের দায়িত্ব কেবল নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো কিংবা আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—কেন এই প্রাণহানি ঘটল? রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা কেমন ছিল? জরুরি বহির্গমন পথ পর্যাপ্ত ও ব্যবহারোপযোগী ছিল কি না? ভবন নির্মাণে নিরাপত্তাবিধি মানা হয়েছিল কি না? অগ্নিকাণ্ডের সময় মানুষ দ্রুত বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে।

    পর্যটনশিল্পের বিকাশের জন্য হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ প্রয়োজন। কিন্তু পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এই শিল্পের প্রসার ঘটানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি রিসোর্ট শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়; সেখানে আসা প্রতিটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, কার্যকর জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন নিশ্চিত করা তাই কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং অপরিহার্য দায়িত্ব।

    এ ধরনের দুর্ঘটনার পর প্রায়ই দেখা যায়, তদন্তের ঘোষণা আসে, কমিটি গঠিত হয়, কিছুদিন আলোচনা চলে; তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনমনে ঘটনাটি গুরুত্ব হারায়। কিন্তু নিহত ব্যক্তিদের পরিবারে শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। একজন স্বামী তাঁর স্ত্রীকে, একজন ভাই তাঁর ভাইয়ের পরিবারকে কিংবা মা-বাবা তাঁদের সন্তানকে হারালে সেই ক্ষতি কোনো ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রতা, দায় এড়িয়ে যাওয়া কিংবা ঘটনাটিকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখিয়ে দায়িত্ব শেষ করার প্রবণতা পরিহার করতে হবে।

    অবশ্য তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও সমীচীন নয়। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি, ভবনের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে রিসোর্টটির অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা সনদ, নিয়মিত পরিদর্শনের নথি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর তদারকির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোথাও দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম কিংবা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনতে হবে। দায়িত্ব পালনে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা তদারককারী সংস্থার ব্যর্থতা প্রমাণিত হলেও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

    এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিদর্শন, অনুমোদন যাচাই, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু কাগজে-কলমে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেই চলবে না; বাস্তবে তা কতটা কার্যকর, সেটিও যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে অতিরিক্ত মানুষের সমাগম হয়—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

    নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের দাবি যথার্থ—তাঁরা শুধু সমবেদনা চান না, বিচারও চান। তাঁদের প্রিয়জনদের ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে তাঁরা যে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রত্যাশা করছেন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। এই দাবিকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উপেক্ষা না করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

    পাটুয়ারটেকের এই অগ্নিকাণ্ড যেন আরেকটি তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা বিস্মৃত সংবাদে পরিণত না হয়। নিহত ব্যক্তিদের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে দুর্ঘটনার কারণ উদ্‌ঘাটন, দায়ীদের আইনানুগ শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি দেশের সব পর্যটনকেন্দ্রের হোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনস্থলের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

    শোক আমাদের মানবিক করে, কিন্তু ন্যায়বিচার সমাজকে দায়িত্বশীল করে তোলে। তাই পাটুয়ারটেকের ঘটনায় শুধু শোক প্রকাশ করেই থেমে গেলে চলবে না। চাই নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বচ্ছতা, দায়ীদের জবাবদিহি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। কারণ, প্রতিটি মানুষের জীবনের মূল্য আছে। সেই মূল্য রক্ষা করা রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

    শুধু শোক নয়, আমরা বিচার চাই; শুধু আশ্বাস নয়, চাই জবাবদিহি।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ