সাংবাদিক গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবে একমত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক আইনে পরিণত হতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সাংবাদিক ও গণমাধ্যম যাতে আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সম্পাদক, সাংবাদিক, গণমাধ্যম সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ সভা শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট সংশোধনের লক্ষ্যে তৈরি খসড়া বিলটি এর আগে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। মন্ত্রিসভা সাইবার পরিসরের তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে খসড়াটি চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছে।
তিনি বলেন, আইনটি যাতে কারও ওপর নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয়, সে জন্য সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিতে খসড়াটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষার্থী ও সাইবার পরিসরের ব্যবহারকারীরা ইতিমধ্যে মতামত দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব মতামত সংকলন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর সম্পাদকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে পরবর্তী সভায় লিখিত মতামত দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আজকের বৈঠকে অনেকে তাদের মতামতের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন এবং বিস্তারিত লিখিত সুপারিশ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বৈঠকে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের একটি প্রস্তাবের কথাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, গণমাধ্যম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আরও সময় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রস্তাব দিয়েছেন মাহফুজ আনাম। এতে গণমাধ্যম যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং আইনে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে এই আইন করতে চাইনি এবং চাই না। কোনো সাংবাদিক যেন এই আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হন, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
সাংবাদিকদের সুরক্ষায় বৈঠকে আরেকটি প্রস্তাব এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ বা গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকার এ প্রস্তাবকে উপযুক্ত ও যুক্তিসংগত মনে করছে।
তিনি জানান, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অংশীজনদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক সুপারিশ নেওয়া হবে। এসব সুপারিশ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সংশোধিত খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
মামলা বা আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কাউকে অনির্দিষ্ট সময় ধরে ঝুলিয়ে না রাখতে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের বিধান রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য একটি বিশেষ সমন্বয় কাঠামো গঠনের কথাও জানিয়েছেন তিনি। এ প্রক্রিয়ায় প্রধান তথ্য কর্মকর্তাকে সমন্বয় ও পরামর্শ গ্রহণের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় যৌথভাবে পুরো প্রক্রিয়া সমন্বয় করবে।
এ ছাড়া সম্পাদক পরিষদের প্রতিনিধি, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম সংগঠনের প্রতিনিধি এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের গঠিত সাইবার বিশেষজ্ঞদের বিশেষ প্যানেল এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা আগামী ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেবেন বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কমিটির সদস্যরা যৌথভাবে বসে এসব সুপারিশ পর্যালোচনা করবেন।
প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতে সংশোধিত খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের আগে আবারও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। তখন সাধারণ মানুষ ও অংশীজনেরা নতুন করে মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবেন। গ্রহণযোগ্য মতামতগুলো খসড়ায় যুক্ত করা হবে।
এরপর আন্তমন্ত্রণালয় সভায় চূড়ান্ত পর্যালোচনার পর বিলটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে এটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।
সংসদে উত্থাপনের পরও বিলটি তাড়াহুড়ো করে পাস করা হবে না বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সংসদীয় আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মতামতের পাশাপাশি সংসদের বাইরে বিভিন্ন সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে পাওয়া মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশ, সমাজ ও বিশেষ করে যুবসমাজকে সাইবার পরিসরে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইন করতে চায় সরকার। সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারিবারিক বন্ধন ও দেশীয় সংস্কৃতি সুরক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।