সেবা না বাড়ালে রুট বাতিল করে সরকারি বাস চালানোর হুঁশিয়ারি

ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে বাস কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবার মান উন্নত করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট রুটে নতুন কোম্পানি গঠন করা হবে। তাতেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না এলে প্রয়োজনে রুট বাতিল করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সোমবার তেজগাঁওয়ের সড়ক ভবনের অডিটরিয়ামে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় বাসমালিকদের সঙ্গে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
বাসমালিকদের উদ্দেশে শেখ রবিউল আলম বলেন, বাসের মান, যাত্রীসেবা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কোম্পানির। কোনো মালিক বাস যথাযথভাবে সংস্কার না করলে কিংবা চালক-কর্মচারীরা নিয়ম না মানলে তার দায় কোম্পানিকেই নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি কোনো বাসমালিককে চিনব না, কোম্পানিকে চিনব। বাসটি আপনার কোম্পানির অধীনে চলে। মালিক মানসম্মতভাবে বাস সংস্কার না করলে, যাত্রীর সুবিধা নিশ্চিত না হলে, চালক কথা না শুনলে এবং কর্মচারীরা শৃঙ্খলা না মানলে সেই বাসের দায় আপনাদের নিতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে না পারলে ওই মালিকের বাস কোম্পানিতে রাখবেন না।’
মন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করে বা ব্যবস্থাপনাকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যবসা করার সুযোগ কারও নেই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব পরিবর্তন চাইব। তা না হলে প্রয়োজনে নতুন কোম্পানি গঠন করব। তাতেও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা না গেলে রুট বাতিল করে সরকারি পর্যায় থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।’
বাসমালিকদের লোকসানের দাবির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আগে যাত্রীদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর ভাড়া সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। নিরাপদ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘আপনারা মানসম্মত যাত্রী পরিবহন নিশ্চিত করুন। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করুন। বাসে চড়তে মানুষকে আগ্রহী করার মতো পরিবেশ তৈরি করুন। প্রয়োজনে আমরা বসব। আপনাদের লোকসান হলে আমরা দেখব। উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে হবে, তাঁদের নির্দিষ্ট মাত্রার লাভেরও প্রয়োজন আছে।’
সেবার মান না বাড়িয়ে শুধু ভাড়া বাড়ানোর দাবি গ্রহণযোগ্য নয় জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায় প্রত্যাশিত লাভ না হলে সেটি যেকোনো মূল্যে চালিয়ে যেতে হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না।
মন্ত্রী বলেন, ‘আপনি সেবা বিক্রি করছেন, তার জন্য যুক্তিসংগত লাভ করবেন। কিন্তু সেবার মান উন্নত না করে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া চাইবেন, এটা হতে পারে না।’
ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে চার্জিং অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও জানান সড়কমন্ত্রী। নির্দিষ্ট এলাকা ও নিয়মের মধ্যে এসব যান চলাচলের ব্যবস্থা করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও এলাকায় তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
উপযুক্ত চালকদের দ্রুত ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, বাস কোম্পানিগুলোকে দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও শারীরিক-মানসিকভাবে সক্ষম চালক চিহ্নিত করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে পাঠাতে হবে। সংশ্লিষ্ট যান চালানোর নিয়ম ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পর্কে চালকের জ্ঞান থাকা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আপনারা উপযুক্ত চালক চিহ্নিত করে পাঠান। তিনি গাড়ি চালাতে জানেন, নিয়ম জানেন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে ফিট—তা নিশ্চিত করুন। আমরা পরীক্ষা নিয়ে লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করব।’
ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বাসস্টপেজ চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর মান উন্নয়নের দায়িত্ব ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) দেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী। রুটভিত্তিক বাস কোম্পানিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বাসস্টপেজ নির্ধারণের পর সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে সেগুলো যাত্রীবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাসের সেবার মান বাড়াতে কোম্পানির ব্যয় এবং মালিকদের কাছ থেকে নেওয়া বিভিন্ন ফি কমানোর পরামর্শও দেন তিনি। নতুন বা ভালো বাস যুক্ত করার ক্ষেত্রে মালিকদের কাছ থেকে নেওয়া ফি ও অন্যান্য খরচ কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে জানান শেখ রবিউল আলম।
তিনি বলেন, ‘আপনারা হয়তো তিন-চার মাস আগের মতো আয় করতে পারবেন না। কিন্তু অনৈতিকভাবে কালেকশন করা হলে সেটা কমিয়ে দেন। মালিকের কাছ থেকে গাড়ি বুকিং ফি বেশি নেওয়া হলে, ট্রিপপ্রতি বেশি টাকা নেওয়া হলে, সেটা কমিয়ে দেন। বাসের সেবার মান বাড়ান।’
পরিবহন মালিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, বাসের সেবার মান উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের জীবনমান পরিবর্তনে উদ্যোক্তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সরকার পরিবহন মালিকদের সঙ্গে নিয়েই খাতে পরিবর্তন আনতে চায়। তবে অনিয়ম, গাফিলতি ও অসহযোগিতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
শেখ রবিউল আলম বলেন, এক দিন বা এক মাসে গণপরিবহন ব্যবস্থার সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে এ উদ্যোগ থেকে সরকার সরে আসবে না। মালিকদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে, পাশাপাশি অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।