হাম পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে আরও ২–৩ মাস: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

দেশে চলমান হাম পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। তিনি বলেছেন, দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি করতে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হাম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ নেই।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে শিশুদের হাম নিয়ে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ এবং গবেষণা অনুদানের চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। কোনো এলাকায় প্রাদুর্ভাব শুরু হলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শুধু হাসপাতালের শয্যা, আইসিইউ কিংবা ভেন্টিলেটরের সংখ্যা বাড়ালেই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হবে না। সংক্রমণ প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, হাম প্রতিরোধে কার্যকর টিকাদানের বিকল্প এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেই। দেশের ইমিউনাইজেশন ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া ঘাটতির কারণেই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন টিকার আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণের মধ্যে টিকাদান বিষয়ে সচেতনতা আরও জোরদার করতে হবে।
টিকাদানের ঘাটতি থেকেই প্রাদুর্ভাব
ডা. এম এ মুহিত বলেন, সময়মতো টিকা আমদানি এবং ২০২৪ সালের টিকাদান কর্মসূচি যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে টিকাদান ব্যবস্থায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এখন হাম পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য জনগণের মধ্যে প্রয়োজনীয় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন করতে হবে। এ লক্ষ্য পূরণে টিকাদানের কভারেজ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
জনবল কম, তবু ব্যাপক টিকাদান
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের তুলনায় বর্তমানে মাঠপর্যায়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মী কম রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘টিকা দেওয়ার জন্য আমাদের মাঠকর্মী থাকার কথা ৪০ হাজার। বর্তমানে আছেন ২৫ হাজার। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ জনবল কম। কিন্তু যারা আছেন, তাঁরা ২০০ শতাংশ পরিশ্রম করেছেন।’
গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে দুর্গম চর এলাকাতেও স্বাস্থ্যকর্মীরা সাইকেল ও নৌকায় করে শিশুদের কাছে টিকা পৌঁছে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। মাত্র এক মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনার বিষয়টিকে বড় ধরনের কর্মযজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যকর্মীদের এই প্রচেষ্টার প্রশংসা করে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও ১০ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন হলেও যদি পাঁচজন দিয়ে কাজ চালাতে হয়, কিংবা ৪০ হাজার টিকাদান কর্মীর প্রয়োজনের বিপরীতে ২৫ হাজার কর্মী থাকেন, তাহলে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ঘাটতি থেকেই যাবে।
শুধু হাম নয়, ভবিষ্যৎ মহামারির প্রস্তুতিও জরুরি
দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কোভিড-১৯-এর মতো মহামারি মানুষের জীবদ্দশায় খুব কমই দেখা গেছে। প্রযুক্তির পরিবর্তন, জীবাণুর ধরন পরিবর্তন, মানুষের জীবনযাত্রা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ভ্রমণ বাড়ার কারণে ভবিষ্যতে নতুন মহামারির ঝুঁকিও রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে এখন ‘প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ বা মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিকে স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিলে যেন আতঙ্কিত হতে না হয় এবং প্রাণহানি কমিয়ে আনা যায়, সে জন্য এখন থেকেই স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
আক্রান্তদের চিকিৎসায়ও গুরুত্ব
হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের উন্নত চিকিৎসা এবং মৃত্যুহার কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান ডা. এম এ মুহিত।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের জনবল ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগিয়েই আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে এবং মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে।
বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রত্যাশা নির্ধারণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া কোনো সমস্যার সমাধান একদিনে বা কোনো ‘ম্যাজিক বুলেটের’ মাধ্যমে সম্ভব নয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক উদ্যোগ চালিয়ে যেতে হবে।
গবেষণায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার
ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় করা হচ্ছে। রোগের প্রকৃতি, সংক্রমণের বিস্তার এবং প্রতিরোধের কার্যকর কৌশল নির্ধারণে গবেষণার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ এবং গবেষকদের অনুদান দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের গবেষকদের আরও বেশি কাজ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারণ ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিতে এসব গবেষণার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।