বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj
কাজ না করেই বিল পরিশোধ

নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুলের বিরুদ্ধে গণপূর্তে কোটি টাকার প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ

নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুলের বিরুদ্ধে গণপূর্তে কোটি টাকার প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালসহ রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প ঘিরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মেডিকেল কলেজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হচ্ছে, বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকার কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না করেই ঠিকাদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী সূত্র ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বরাদ্দ থাকা প্রায় ৫ কোটি ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা এবং গণপূর্ত বিভাগের আওতাধীন একাধিক প্রকল্প মিলিয়ে মোট প্রায় ২০ কোটির বেশি টাকার কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। তবে এসব কাজের বড় অংশই যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

কাজ শেষ না করেই সম্পূর্ণ বিল পরিশোধের অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রকল্পে নির্ধারিত কাজ শেষ না করেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, অর্থবছরের শেষ দিকে বরাদ্দ ফেরত না যাওয়ার উদ্দেশ্যে দ্রুততার সঙ্গে কাগজপত্রে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল অনুমোদন করা হয়।

ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, রেডিওলজি বিভাগ, সার্জারি ওয়ার্ড, কেবিন ব্লক, স্টাফ কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন স্থানে টয়লেট সংস্কার, ছাদ মেরামত, গ্যাসলাইন পরিবর্তন, ওয়াটারপ্রুফিংসহ বহু কাজের জন্য লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢামেকে পলেস্তারা খসে রোগী আহত, মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন

সম্প্রতি ঢামেক হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের ৩০৩ নম্বর ওয়ার্ডে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে এক রোগী আহত হওয়ার ঘটনায় অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, বড় অঙ্কের বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত মেরামত ও মান নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি থাকায় এমন দুর্ঘটনা ঘটছে।

এই ঘটনার পরও এখনো কোনো তদন্ত কমিটি গঠন না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট মহলে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

টেন্ডার ও বিল প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম ও আর্থিক সুবিধা গ্রহণের একটি চক্র সক্রিয় ছিল। কিছু ঠিকাদারের অভিযোগ অনুযায়ী, কাজের কার্যাদেশ প্রদান থেকে শুরু করে বিল উত্তোলন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের চাপ ছিল।

এছাড়া এলটিএম (Limited Tender Method) পদ্ধতিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

কাজ শুরুর আগেই বিল, পরে প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে বৈধতা

সূত্রের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে কাজ শুরু হওয়ার আগেই বিল পাস করা হয়েছে। পরে সেই কাজ কাগজে-কলমে সম্পন্ন দেখাতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করে প্রশাসনিকভাবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় গলদ তৈরি হয়েছে এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

অর্থবছরের শেষ সময়ে দ্রুত বিল পাসের অভিযোগ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার মতে, অর্থবছরের শেষ সময়ে বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত বিল পাসের প্রবণতা তৈরি হয়। এতে প্রকৃত কাজ সম্পন্ন না হলেও প্রশাসনিকভাবে প্রকল্প শেষ দেখানো হয়।

তথ্য দিতে অনীহা ও সাংবাদিক প্রবেশে বাধার অভিযোগ

তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য চেয়ে আবেদন করতে গেলে গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় তা গ্রহণে অনীহার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কোনো নথি গ্রহণ না করার কথা জানানো হয়।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ যে দিয়েছেন তাকে বলেন এসে প্রমাণ করতে। ঢাকা মেডিকেলের পুরাতন ভবনে পলেস্তার দিয়েও লাভ নাই। কাজে কোন অনিয়ম করা হয়নি। ১০০% স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। যদি কেউ অনিয়মের প্রমাণ দিতে পারে তাহলে অধিদপ্তর যে ব্যবস্থা নিবে তা মেনে নিবো। পরে তিনি মিটিং এ আছেন বলে ফোন কেটে দেন।

তদন্ত কমিটির দাবি জোরালো

এত বড় অঙ্কের প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় দ্রুত স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল। তাদের মতে, প্রকৃত কাজের অগ্রগতি, বিল পরিশোধ প্রক্রিয়া এবং ঠিকাদারদের ভূমিকা যাচাই না করলে এই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়।

এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও উদ্বেগ বাড়ছে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন