সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj

হরমুজের পর এবার মালাক্কা প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

হরমুজের পর এবার মালাক্কা প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ মালাক্কা প্রণালি। বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন ও ভূরাজনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনার জেরে অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ রুট মালাক্কা প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।

মালাক্কা প্রণালি দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত এবং এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। সিঙ্গাপুরের নিকটবর্তী ফিলিপস চ্যানেল এলাকায় এর সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২.৮ কিলোমিটার।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমা ব্যবহার করে সামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের অনুমতি চেয়ে প্রস্তাব দেওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রেক্ষাপটে দেওয়া এই প্রস্তাব এখনও বিবেচনাধীন বলে জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মালাক্কা প্রণালি ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর সংযোগস্থল। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের গবেষক আজিফাহ আস্ত্রিনা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের জন্য এই পথ অপরিহার্য।

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের প্রায় ২৯ শতাংশ। একই সময়ে প্রতিদিন প্রায় ২৬ কোটি ঘনমিটার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও এই পথ দিয়ে গেছে।

লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিশেষজ্ঞ গোকি বালসি জানান, জ্বালানির পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস, ভোগ্যপণ্য, যন্ত্রপাতি, গাড়ি ও শস্যসহ বিভিন্ন পণ্যের বড় অংশই এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। তার ভাষায়, “বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ গাড়ি বাণিজ্য এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি মালাক্কা প্রণালি ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও ক্রমেই সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে সামুদ্রিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতা বাড়লে এই পথ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এছাড়া নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক তথ্য সংস্থার মতে, ২০২৫ সালে মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালিতে ১০৮টি জলদস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। পাশাপাশি সুনামি ও আগ্নেয়গিরির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও বিদ্যমান।

বিশেষজ্ঞ আস্ত্রিনা মনে করেন, বর্তমান নিরাপত্তা কাঠামো বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের বাণিজ্য বিঘ্নের আশঙ্কা কম।

চীনের জন্য মালাক্কা প্রণালির গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশটির প্রায় ৭৫ শতাংশ তেল আমদানি এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্যের বড় অংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। এ প্রেক্ষাপটে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ ধারণাটি সামনে আসে, যা এই নির্ভরতার ঝুঁকিকে নির্দেশ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প পথ যেমন সুন্দা বা লম্বক প্রণালি থাকলেও সেগুলো পুরোপুরি কার্যকর নয়। ফলে মালাক্কার ওপর নির্ভরতা কমানো সহজ নয়।

সব মিলিয়ে, সরাসরি সংঘাত না হলেও মালাক্কা প্রণালিকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়লে বৈশ্বিক বাণিজ্যে পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। এতে বীমা ব্যয় বৃদ্ধি, ঝুঁকি ধারণা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


দৈএনকে/জে, আ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন