সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj

নদীর নাম কলঙ্কিনী: বিশ্বাসের গল্প, বাস্তবতার প্রশ্ন

নদীর নাম কলঙ্কিনী: বিশ্বাসের গল্প, বাস্তবতার প্রশ্ন
ছবি : নতুন কাগজ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

দখল-দূষণে বিলীন বাস্তবতা, তবু মানুষের মুখে আজও জীবন্ত রহস্যময় ইতিহাস। বাংলাদেশের নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হাজারো ছোট-বড় নদী। তবে দখল ও দূষণের কারণে দেশের অনেক নদী আজ মৃতপ্রায়। তেমনই এক বিস্মৃতপ্রায় নদী হলো ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মগটুলা ইউনিয়নের ‘কলঙ্কিনী’ নদী—যা আজ বাস্তবে প্রায় বিলীন হলেও লোককথায় এখনো জীবন্ত।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কলঙ্কিনী নদীটি ধীতপুর ও বাগবেড় গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বড়হিত হারহাইল বিল থেকে নবাবগঞ্জ বাজার, বাঁশাটি, কুড়েরপাড় নাউরী অতিক্রম করে শেষে বাকাইল বিলে গিয়ে মিলিত হতো। একসময় নদীটি ছিল প্রাণচঞ্চল, মাছ ও নৌযানে ভরপুর। তবে কালের পরিক্রমায় ভরাট, দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে নদীটি এখন প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।

নদীটিকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্যময় লোককাহিনি। প্রচলিত রয়েছে, বহু বছর আগে এই নদীতে একটি বড় সিন্দুক পাওয়া যায়। স্থানীয়রা সেটিকে নদীর তীরের একটি বিশাল বটগাছের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন নদীটি অস্বাভাবিকভাবে উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড স্রোতে বটগাছসহ উসমান নামের এক ব্যক্তির ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকেই নদীটির নাম হয়ে যায় ‘কলঙ্কিনী’।

আরেকটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় এই নদী ছিল মানুষের প্রয়োজন পূরণের এক রহস্যময় উৎস। গ্রামে বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান হলে রাতের বেলায় নদীর কাছে বাসন-কোশন চাইলে সকালে তা নির্দিষ্ট স্থানে পাওয়া যেত। তবে এক নারী লোভবশত একটি থালা আত্মসাৎ করলে সেই ‘অলৌকিক দান’ বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনাকেই নদীর ‘কলঙ্ক’ হিসেবে দেখা হয় এবং সেখান থেকেই নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, “এই নদীতে বড় বড় গজার মাছ ছিল। মানুষ ভয় পাইতো মাছ দেইখ্যা। মুরব্বিদের মুখে শুনছি—মানুষের বিয়াশাদি বা অনুষ্ঠান হইলে এই নদী থেকে বাসন-কোশন পাওয়া যাইতো।”

স্থানীয়দের মতে, একসময়কার প্রভাবশালী এই নদী এখন কেবল স্মৃতির অংশ। নদী পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এমন আরও বহু নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট নদীগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে দখলমুক্ত করা, নিয়মিত খনন এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

তবে উপজেলার বাসিন্দা মো. সোলেমান মিয়া মনে করেন, বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অলৌকিকতার কোনো প্রমাণিত অস্তিত্ব নেই। যেসব ঘটনা অলৌকিক মনে হয়, সেগুলোর পেছনে সাধারণত অজানা বৈজ্ঞানিক কারণ, ভুল ধারণা বা লোকবিশ্বাস কাজ করে। তাই অলৌকিকতা মূলত বিশ্বাসের বিষয়, বাস্তব প্রমাণের নয়।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ