বদলে যাওয়া বলিউড খলনায়িকাদের গল্প

হিন্দি সিনেমার পর্দায় নারী মানেই একসময় ছিল আত্মত্যাগ, মমতা আর আদর্শের প্রতিমূর্তি। কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক বলিউডে নারী চরিত্র যখন ‘নেগেটিভ’ বা নেতিবাচক, তখন সেটিই হয়ে উঠছে গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কেন্দ্রবিন্দু। সমাজ আর সিনেমার চাপিয়ে দেওয়া ‘নম্র’ ইমেজের গণ্ডি ভেঙে এই চরিত্রগুলো তৈরি করছে এক নতুন বাস্তবতা, যেখানে নারীরা আর ‘ভালো’ হওয়ার চাপে পিষ্ট নয়।
পুরুষতন্ত্রের ভিড়ে নারীহীন ‘ধুরন্ধর’
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ সিনেমাটি বক্স অফিসে ঝড় তুললেও জন্ম দিয়েছে এক বড় বিতর্কের। সিনেমাটি পুরোপুরি পুরুষকেন্দ্রিক; যেখানে সহিংসতা, ক্ষমতা আর ধ্বংসের খেলায় নারীর কোনো উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নেই। নারী ইতিহাস মাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়েও এমন একটি সিনেমা আলোচনার কেন্দ্রে থাকাটা অনেকের কাছে বিস্ময়কর। তবে এই ‘পুরুষালি’ ঝড়ের বিপরীতে আশার আলো দেখাচ্ছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো।
ওটিটির নতুন দিগন্ত: ত্রুটিপূর্ণই যখন জীবন্ত
‘ধুরন্ধর’-এর পুরুষতান্ত্রিক আবহের বাইরে ওটিটির পর্দায় ‘সুবেদার’ ও ‘অ্যাকিউজড’-এর মতো কাজগুলো নিয়ে আসছে অস্বস্তিকর, অধিকারবোধে ভরা এবং আত্মকেন্দ্রিক নারী চরিত্র। এই নারীরা নিখুঁত নন; বরং ত্রুটিপূর্ণ ও জটিল। কিন্তু এই জটিলতাই তাঁদের রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে জীবন্ত করে তুলেছে।
ভ্যাম্প থেকে ফেম ফ্যাটাল: বিবর্তনের ইতিহাস
বলিউডে নারী খল চরিত্রের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ষাট ও সত্তরের দশকে হেলেন, বিন্দু বা অরুনা ইরানিরা ছিলেন মূলত ‘ভ্যাম্প’, যারা পশ্চিমা পোশাক আর উইগ পরে নায়কের পথে বাধা সৃষ্টি করতেন। নব্বইয়ের দশকে লতা পাওয়ার বা শাশিকালের মতো অভিনেত্রীরা পর্দায় অবতীর্ণ হতেন দাপুটে মা বা শাশুড়ির চরিত্রে, যাদের কাজই ছিল পুত্রবধূর জীবন দুর্বিষহ করা।
তবে কালক্রমে এই চরিত্রে যোগ হয়েছে বুদ্ধিমত্তা আর যৌনতার মিশ্রণ। ‘কর্জ’-এ সিমি গারেওয়াল কিংবা ‘মকবুল’-এ টাবুর ‘নিম্মি’ চরিত্রটি হিন্দি সিনেমার আইকনিক ‘ফেম ফ্যাটাল’ হিসেবে স্বীকৃত। টাবুর এই চরিত্রটি ছিল লেডি ম্যাকবেথের ছায়া, যা নিজের স্বার্থে খুনের প্ররোচনা দেয়। পরবর্তী সময়ে ‘ইশকিয়া’তে বিদ্যা বালান বা ‘আন্ধাধুন’-এ টাবুর অভিনয় প্রমাণ করেছে, নারী তার ভেতরের অন্ধকারকে অনায়াসেই সৌন্দর্য দিয়ে আড়াল করতে পারে।
ভৌতিক সত্তা ও প্রতিশোধের রূপক
নারী খল চরিত্রের আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি ‘স্ত্রী’, ‘বুলবুল’ বা ‘ভুল ভুলাইয়া ২’-এর মতো অতিপ্রাকৃতিক চরিত্রের কথা না বলা হয়। জাদুকরী বা চিল্লাইনি—যাই হোক না কেন, এই চরিত্রগুলোর পেছনে থাকে এক বেদনাদায়ক অতীত। শাবানা আজমি (মাকড়ি) বা কঙ্কনা সেনশর্মা (এক থি ডায়েন)—এঁরা সবাই দেখিয়েছেন কেন নারীরা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। ‘বুলবুল’ বা হলিউডের ‘উইকেড’ আমাদের শেখায়, খলতা জন্মগত নয়, পরিস্থিতি মানুষকে অন্য পথ বেছে নিতে বাধ্য করে।
নতুন যুগের বাস্তবতা
‘গুপ্ত’-এ কাজল কিংবা ‘কৌন’-এ উর্মিলা মাতন্ডকর শৈশব থেকেই সমাজবিরোধী চরিত্রে নজর কেড়েছেন। অন্যদিকে ‘দিল্লি ক্রাইম ৩’-এর বড় দিদি বা আম্মা চরিত্রগুলো মূলত ব্যবস্থার শিকার হয়ে খলচরিত্রে রূপান্তরিত।
আজকের বলিউডে নারী প্রতিপক্ষ চরিত্র আর শুধু ‘ভ্যাম্প’ বা ‘খলনায়িকা’ নয়। তারা কখনো ভুক্তভোগী, কখনো বিদ্রোহী, আবার কখনো কেবলই বাস্তবসম্মতভাবে স্বার্থপর। এই পরিবর্তন সিনেমার গল্প বলাকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি পর্দার আড়ালে নারীদের উপস্থাপনাকেও করেছে আরও সাহসী ও বাস্তবমুখী।
দৈএনকে/জে, আ