জনগণের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার এখন নির্বাচনের মূল ইস্যু

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নাগরিকদের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি উদ্যোগী হয়ে এই ইশতেহারটি প্রস্তুত করেছে, যা সাধারণ মানুষের শান্তি, স্বস্তি, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার উপর জোর দেয়।
ইশতেহারটি প্রকাশের সময় কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, বিগত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবং চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এটি অপরিহার্য। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ভোট দিতে হলে মানুষকে জানা দরকার তারা কেন ও কাকে ভোট দিচ্ছেন। সেই কারণে ইশতেহারে রাজনৈতিক দলের ইশতেহার সম্পর্কে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের জনগণ শুধু ভোটের অধিকারই চায় না, বরং তাদের জীবনের শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা এবং মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। এছাড়াও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এই ইশতেহারের অন্যতম মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের সাধারণ মানুষের মতামত ও আকাঙ্খা সংগ্রহ করে ইশতেহারটি তৈরি করা হয়েছে। তারা বলেন, এই ইশতেহারে শুধুমাত্র সবচেয়ে জরুরি ৫টি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে: জনগণের শান্তি, স্বস্তি, নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সরকারের জবাবদিহি।
কমিটির এক নেতার ভাষ্য, “আমরা ইশতেহারটি এমনভাবে তৈরি করেছি যাতে এটি সহজবোধ্য হয় এবং সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে। কঠিন কেতাবি ভাষার ব্যবহার আমরা এড়িয়েছি, কারণ সেটি সাধারণ জনগণকে মূল প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।”
এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ইশতেহারটি দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে কমিটি আশা করছে।
১. জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত ন্যায্যতা
-
শহীদ ও আহতদের তালিকা প্রকাশ এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
-
গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের দলীয় বয়ানমুক্ত রাষ্ট্রীয় ইতিহাস তৈরির উদ্যোগ।
-
হত্যা ও গণহত্যার বিচার সম্পন্ন করা।
-
ফুলবাড়ী ও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানকারীদের স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২. জননিরাপত্তা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
-
পুলিশ ও বিচারকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও থানার ওসির দায়বদ্ধতা নির্ধারণ।
-
বিচারিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও ভিডিও রেকর্ডিং।
-
র্যাব বিলুপ্ত ও অন্যান্য বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ।
-
আলোচিত সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা।
৩. নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক অধিকার
-
শূন্য জামানত, প্রার্থীদের সমান সুযোগ, টাকার খেলা নিয়ন্ত্রণ।
-
“না ভোট” ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার সম্প্রসারণ।
-
অপরাধী, বিদেশী বসবাসকারী, ঋণখেলাপী প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশে বাধা।
৪. বাজেটের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা
-
বাজেটের বিস্তারিত হিসাব উন্মুক্ত করা, ডিপিপি প্রকাশ, ফিজিবিলিটি স্টাডি বাধ্যতামূলক।
-
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫% বরাদ্দ।
-
বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত।
৫. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
-
আর্থিক অপরাধীদের বিচার ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত।
-
ব্যাংক ব্যবস্থায় দলীয় প্রভাব কমানো।
-
আন্তর্জাতিক ঋণ ও অর্থায়ন নিয়ে স্বাধীন তদন্ত।
-
জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও প্রবাসী রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ।
৬. কৃষক, পোল্ট্রি, মৎস্যচাষী ও ভোক্তা নিরাপত্তা
-
ইউনিয়ন ও জেলায় ন্যায্য মূল্যে কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিক্রির সুপারসেন্টার/স্টোর।
-
কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতির মেরুদণ্ড শক্ত করা।
-
প্রাকৃতিক চাষ ও মাছ-মুরগীর জন্য ভর্তুকি ও প্রণোদনা।
-
খাদ্য ও মাছের ন্যায্য বণ্টন, বাজারের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ।
৭. প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের অধিকার
-
ন্যূনতম মজুরি ও বেতন, রিভলভিং ফান্ড, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন।
-
ক্ষতিপূরণ, নারী-পুরুষ মজুরীতে সমতা, সরকারি চাকরিতে কোটা।
৮. অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক নিরাপত্তা
-
চুক্তিপত্র, সাপ্তাহিক ছুটি, ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা।
৯. ফ্রিল্যান্সারদের নিরাপত্তা
-
গিগ শ্রমিক স্বীকৃতি, সোর্স ট্যাক্স বাতিল, গিগ প্লাটফর্ম জবাবদিহি।
১০. প্রবাসী শ্রমিক নিরাপত্তা
-
বিশেষায়িত সেল, কবরের অধিকার, শ্রমিকবান্ধব এয়ারপোর্ট।
১১. দেশীয় ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা
-
চাঁদাবাজি বন্ধ, বৈধতা প্রদানের মাধ্যমে হকার/ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুরক্ষা।
-
দেশীয় শিল্পখাত উন্নয়ন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
১২. শিক্ষা খাত
-
সরকারি বিদ্যালয়ে সরকারি কর্মকর্তা সন্তানদের বাধ্যতামূলক ভর্তি।
-
শিক্ষার্থীর চাপ কমানো, স্বাধীন শিক্ষা কমিশন।
-
মাতৃভাষায় শিক্ষা, প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতি ৩০০ শিক্ষার্থী, শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার মানোন্নয়ন।
-
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত।
১৩. চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য
-
সরকারি হাসপাতাল মানোন্নয়ন, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ।
-
নিরাপদ ওষুধ বিতরণ, হাসপাতাল তদারকি, বেসরকারি হাসপাতালে সীমাবদ্ধতা।
-
কমিউনিটি ক্লিনিক, পাবলিক টয়লেট ও নিরাপদ পানির কল।
১৪. পরিবেশ ও প্রকৃতি
-
প্রাণ-প্রকৃতিবিরোধী প্রকল্প বন্ধ।
-
নদী, খাল, জলাশয় রক্ষা কমিটি, বন সংরক্ষণ, আগ্রাসী প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ।
-
শহরে ফলদ বৃক্ষ, বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ।
-
হাওর পুনর্বাসন, পরিবেশবান্ধব আবাসন ও নির্মাণ, পাহাড় সংরক্ষণ।
১৫. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত
-
রেন্টাল বিদ্যুৎ বন্ধ, কয়লা/পারমাণবিক বিদ্যুৎ বাতিল।
-
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্যাস নির্ভর উৎপাদন, বাপেক্স শক্তিশালীকরণ।
-
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার দক্ষতা বৃদ্ধি।
১৬. নিরাপদ সড়ক
-
মহাসড়কে সড়ক বিভাজক, গতি নিয়ন্ত্রণ।
-
আলাদা রাস্তা, স্পিড লিমিট, চালক বেতনভুক্ত।
-
নিরাপদ সড়ক কমিশন, ভিআইপি রোড অবসান, রাস্তা ও ফুটপাত সংস্কার।
এই ২৫ দফা মূলত জনগণের জীবন, নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বচ্ছ অর্থনীতি, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত।