রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের ছায়ায় যাত্রাবাড়ীর পরিবহন চাঁদাবাজি

রাজধানীর প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ী। চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দক্ষিণ-বঙ্গ ও পূর্বাঞ্চলের কয়েক ডজন জেলার যানবাহন এই মোড় হয়েই ঢাকায় প্রবেশ করে। প্রতিদিন হাজার হাজার বাসের চাকা ঘোরে এখানে, আর সেই চাকার সঙ্গেই ঘোরে কোটি টাকার চাঁদাবাজির চক্র। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চেহারার বদল ঘটলেও, চাঁদাবাজির চিরচেনা চিত্রটি মোটেও বদলায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে একদল ‘বড় ভাই’ পুরো পরিবহন খাতকে জিম্মি করে রেখেছেন।
নেপথ্যে যারা: রাজনীতির ঢাল ও ক্যাডার বাহিনী
অনুসন্ধানে জানা যায়, যাত্রাবাড়ী মোড়, সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল এবং ধোলাইপাড় এলাকায় চাঁদাবাজির মূল নিয়ন্ত্রক স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। আগে যারা এই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন, পটপরিবর্তনের পর তারা আত্মগোপনে গেলেও জায়গা দখল করে নিয়েছেন নতুন মুখ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি বাস থেকে ‘জিপি’ (গেট পাস), ‘রাস্তা খরচ’ ও ‘সাংগঠনিক তহবিল’—এমন নানা অজুহাতে টাকা তোলা হচ্ছে। এই টাকা তোলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো রশিদ দেওয়া হয় না। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের হেলপারদের কাছ থেকে হুঙ্কার দিয়ে টাকা আদায় করে ২০-২৫ বছর বয়সী একদল তরুণ। এদের হাতে থাকে লাঠি বা পাইপ, আর পেছনে থাকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা তথাকথিত ‘ক্যাডার’রা।
যেভাবে চলে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক
যাত্রাবাড়ী এলাকায় মূলত তিন স্তরে চাঁদাবাজি চলে:
টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড ফি: সায়দাবাদ ও যাত্রাবাড়ী থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি দূরপাল্লার বাসকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
ওয়েবিল ও গেট পাস: লোকাল বাসগুলোকে প্রতি ট্রিপে (একবার আসা-যাওয়া) ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিতে হয় নির্দিষ্ট পয়েন্টে। এই টাকা না দিলে বাস আটকে রাখা বা চালককে মারধর করার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক।
ফুটপাত ও লেগুনা স্ট্যান্ড: যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা শত শত লেগুনা ও অবৈধ ইজিবাইক থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০০-৩০০ টাকা আদায় করা হয়।
একজন বাস চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "ভাই, দল পাল্টায় কিন্তু আমাদের কপাল পাল্টায় না। আগে এক পক্ষরে দিতাম, এখন আরেক পক্ষরে দেই। টাকা না দিলে গাড়ি চলতে দেয় না। প্রতিবাদ করলে মারধর তো আছেই, গাড়ির কাঁচও ভেঙে দেয়।"
কোটি টাকার ভাগবাটোয়ারা
হিসাব করে দেখা গেছে, যাত্রাবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন পরিবহন খাত থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদা তোলা হয়। মাসে এই অংকের পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েক কোটি টাকায়। এই টাকার একটি বড় অংশ চলে যায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পকেটে। একটি অংশ যায় নামধারী শ্রমিক নেতাদের কাছে, আর বাকিটা ভাগ হয় ক্যাডার ও এলাকাভিত্তিক মাস্তানদের মধ্যে। এমনকি প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার পকেটেও এই টাকার ভাগ যায় বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
এই চাঁদাবাজির চূড়ান্ত বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ যাত্রীদের ঘাড়ে। বাসের মালিকরা চাঁদাবাজির এই অতিরিক্ত খরচ পুষিয়ে নিতে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করেন। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যাতায়াত খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যাত্রাবাড়ী মোড়ে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ এক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সবাই জানে কারা চাঁদাবাজি করে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না। আমরা সাধারণ মানুষ সবসময়ই বলির পাঁঠা।"
প্রশাসনের বক্তব্য
যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। তবে অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয় থাকায় এবং ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ না করায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে এলাকাটি পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।