ক্ষমতা, প্রতিরোধ ও রাজনীতির দীর্ঘ ছায়া: খালেদা জিয়ার প্রস্থান

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়; এটি একটি সময়ের অবসান, একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ছেদ এবং বহু প্রশ্নের অনিবার্য মুখোমুখি হওয়া। চার দশকের বেশি সময় ধরে যিনি ক্ষমতা ও প্রতিরোধ—উভয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তার প্রস্থান ইতিহাসের ভারী পাতায় স্থায়ী ছাপ রেখে যাবে।
খালেদা জিয়া ছিলেন সেই বিরল রাজনৈতিক চরিত্র, যিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন প্রস্তুতি নয়, বরং শোক, সংকট ও দায়বদ্ধতার ভার নিয়ে। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যার পর একটি দিশাহীন দল এবং অস্থির রাষ্ট্র বাস্তবতায় তার উত্থান অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে কেবল দলের নেতা নয়, বরং রাষ্ট্রক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধায় ভূষিত করেছিল। সেই অভিধা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল তার নেতৃত্বের নৈতিক ভিত্তি। বারবার কারাবরণ, অন্তরীণ ও প্রশাসনিক দমন সত্ত্বেও তিনি যে রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছিলেন, তা তাকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে আলাদা জায়গা দেয়। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই আপসহীনতার রাজনীতি নিজেই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ক্ষমতায় থাকাকালে সহনশীলতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণে কতটা আপসহীন ছিলেন—সে প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত।
১৯৯১ সালে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার দায়িত্ব গ্রহণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তার শাসনামলের অন্যতম বড় অর্জন ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন। এটি কেবল একটি সাংবিধানিক সংশোধনী নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে একটি মৌলিক পরিবর্তন। তবে তার পরবর্তী শাসনামলগুলো ছিল সাফল্য ও বিতর্কের যুগলবন্দিতে আবদ্ধ। উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা ও পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি দুর্নীতি, দলীয়করণ ও রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগও তার সময়কালের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
২০০৭ সালের পর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কার্যত এক দীর্ঘ অবরুদ্ধ অধ্যায়ে প্রবেশ করে। আদালত, কারাগার ও হাসপাতাল—এই তিন পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে তার শেষ জীবনের রাজনীতি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। এই নিঃসঙ্গতা ছিল কেবল রাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, সময়ের সঙ্গেও। নতুন প্রজন্মের রাজনীতি, নতুন ভাষ্য ও নতুন বাস্তবতায় তিনি ক্রমেই হয়ে উঠছিলেন অতীতের এক শক্ত ছায়া।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের একটি অনস্বীকার্য সত্য হলো—তিনি কখনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। এটি তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ, আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির সীমাবদ্ধতার প্রতিফলনও বটে। ২০১৪ সালের পর তার অনুপস্থিতি নির্বাচনী রাজনীতিকে একতরফা ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে—যার দায় শুধু বিরোধী দল নয়, রাষ্ট্রকেও বহন করতে হবে।
ইতিহাস খালেদা জিয়াকে বিচার করবে আবেগ দিয়ে নয়, প্রভাব দিয়ে। তিনি কি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছেন, নাকি মেরুকরণকে গভীর করেছেন? তিনি কি আপসহীনতার রাজনীতি দিয়ে স্বৈরাচার প্রতিরোধ করেছেন, নাকি প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর একরৈখিক নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত—খালেদা জিয়া ছাড়া বাংলাদেশের গত চার দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। তার মৃত্যু সেই ইতিহাসকে সম্পূর্ণ করল, কিন্তু বিতর্ককে নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ যে সংকট, বিভাজন ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, খালেদা জিয়ার প্রস্থান সেই সংকটের দায়ভার আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো—নেতারা চলে যান, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার জাতিকে বহন করতে হয় দীর্ঘকাল।