শিল্পকলা একাডেমির ‘অঘোষিত সম্রাট’ জিএম জাকিরের দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রশাসনিক বিভাগে গত কয়েক বছর ধরে রাজত্ব চালিয়েছেন এক ‘অঘোষিত সম্রাট’। তিনি আর কেউ নন, একাডেমির প্রশাসন বিভাগের উপপরিচালক জিএম জাকির হোসেন। সাবেক মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে এবং তৎকালীন আওয়ামী ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি শিল্পকলাকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, বদলি-পদোন্নতি বাণিজ্য এবং নারী শিল্পীদের শ্লীলতাহানির মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
অফিস রুমে গানের আসর ও নৈতিক স্খলন: একাডেমির একাধিক শিল্পী ও কর্মকর্তা জানান, জিএম জাকির হোসেন প্রশাসন বিভাগে নিজের অফিস রুমকে ব্যক্তিগত গান শেখানোর কোচিং সেন্টারে রূপান্তরিত করেছিলেন। সেখানে টিউশন করানোর আড়ালে তিনি বিভিন্ন নারীকে অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন। সম্প্রতি এক নারী শিল্পীকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে আপত্তিকর প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগে তাকে কার্যালয়ের ভেতরেই জনসম্মুখে জুতাপেটা ও চড়-থাপ্পড় মারার ঘটনা ঘটেছে বলে শিল্পী মহলে চাউর রয়েছে। নিয়মিত শিল্পী ‘হীরকরাজা’র অভিযোগ বিশ্লেষণ করে এই ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। কোনো নারী প্রতিবাদ করলে তাকে তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভয়ভীতি ও মিথ্যা মামলার হুমকি দেওয়া হতো।
৩০ কোটি টাকা গায়েব করার চেষ্টা ও চেক জালিয়াতি: শিল্পকলা একাডেমির সাবেক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জিএম জাকির হোসেন কোনো অনুষ্ঠান না করেই একাডেমির ফান্ড থেকে ৩০ কোটি টাকা গায়েব করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ওই কর্মকর্তা রাজি না হওয়ায় তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়। এছাড়া শিল্পীদের নামে বরাদ্দকৃত চেকের টাকা তিনি নিজেই জাল সইয়ের মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট: অভিযোগ রয়েছে, জাকির হোসেন একাডেমিতে একটি নিজস্ব সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। তার এই সিন্ডিকেটের প্রধান সহযোগী হিসেবে নাম এসেছে তার পিএস সুমন মিয়া, প্রশাসনিক বিভাগের আসমা বেগম এবং অর্থ পরিচালক জিয়াউদ্দিন আহমেদ বিপ্লবের। এই চক্রের মাধ্যমে তিনি পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তদন্ত কমিটির সদস্য থাকাকালীন তিনি অর্থের বিনিময়ে অপরাধী কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিয়ে তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দিয়েছেন বলেও ভুক্তভোগীরা জানান।
শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ: দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার সুবাদে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি বর্তমানে বিপুল সম্পদের মালিক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, একাধিক প্লট এবং নামি-দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি রয়েছে তার। এছাড়া স্ত্রী ও সন্তানদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর (FDR) ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে বলে শিল্পকলার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিশ্চিত করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিবিড় তদন্ত করলে তার এই পাহাড়সমান সম্পদের রহস্য উন্মোচিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি: জিএম জাকির হোসেনের এসব অপকর্মের কারণে জাতীয় পর্যায়ের এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও কাজের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও তার প্রভাব কমেনি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিল্পী ও কর্মচারীবৃন্দ। এই ‘অসৎ’ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুদক কর্তৃক তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত জিএম জাকির হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।