ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অব্যবস্থাপনায় দিশেহারা নগরবাসী

রাজধানীর চিরচেনা যানজট প্রতিনিয়ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। যার কারণে নগরবাসী নাজেহাল হয়ে পড়েছে। সপ্তাহের তৃতীয় কর্মদিবসে সকাল থেকেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থেকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অফিসগামী যাত্রী, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষকে। একদিকে চলমান উন্নয়ন প্রকল্প, অন্যদিকে ফিটনেসবিহীন গাড়ির দাপটে ঢাকার রাজপথ যেন স্থবির হয়ে পড়েছে।
যানজটের বর্তমান চিত্র: সকাল ৮টা থেকেই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী শনিআখরা, হানিফ ফ্লাইওভার, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা এবং প্রগতি সরণি এলাকায় যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জট ছড়িয়ে পড়ে সাইনবোর্ড, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, মতিঝিল এবং গুলিস্তান এলাকায়। বিশেষ করে বিমানবন্দর সড়কে বিআরটি প্রকল্পের কাজ এবং বিভিন্ন স্থানে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির ফলে যানবাহনের গতি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, মাত্র ২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা।
ফিটনেসবিহীন লক্কর- ঝক্কড় গাড়ির দৌড়াত্ব: যানজট ভয়াবহ হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে প্রতিদিন শত শত জরাজীর্ণ বাস ও হিউম্যান হলার চলাচল করছে।
এসব লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি প্রায়ই মাঝরাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে, যার ফলে পেছনের শত শত যানবাহন আটকা পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া এসব ত্রুটিপূর্ণ যানের ধীরগতি ও কালো ধোঁয়া পরিবেশের পাশাপাশি সড়কের শৃঙ্খলার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিআরটিএ অবৈধ রোড পারমিট: বিআরটিএ এর কিছু অসৎ কর্মকরতাদের যোগ সাজশে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে প্রতিনিয়তো সড়কে না চলাচল করার মতো পরিবহন গুলোকে ফিটনেসসহ রোড পারমিটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলছেন সড়কে চলাচল করা ভুক্তভোগীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতামত:কয়েকজন পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার যানজট এখন একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সাথে প্রতিবেদকের কথা হলে তারা কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে অবগত করেন, যেমন:-
সড়কে তদারকির অভাব: বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশের কঠোর তদারকি না থাকায় সড়কে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি কমানো যাচ্ছে না।
শৃঙ্খলাহীনতা: মাঝরাস্তায় গাড়ি বিকল হওয়া এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানোর ফলে জট কয়েক গুণ বেড়ে যায়। একটি বিকল গাড়ি ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলে তার প্রভাবে পেছনের কয়েক কিলোমিটার সড়কে যানজট কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে।
সুপারিশ : বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়িগুলো অবিলম্বে রাস্তা থেকে সরিয়ে স্ক্র্যাপ করে ফেলা উচিত।
ফিটনেস বিহীন গাড়ী চলাচলে প্রশাসনকে যারা সুপারিশ করবে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইন প্রয়োগ করা।
ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ: মিরপুর থেকে মতিঝিলগামী এক বেসরকারি চাকুরিজীবী মাহমুদুল হাসান বলেন, "সকাল সাড়ে ৭টায় বাসে উঠেছি, এখন সাড়ে ১০টা বাজে, এখনও ফার্মগেট পার হতে পারিনি। ফিটনেসবিহীন বাসগুলো রাস্তার মাঝখানে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, দেখার কেউ নেই, সড়কে গাড়ি পার্কিংসহ অব্যধ অটো রিক্সার চাপ এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জোর দাবী তুলেন উপদেষ্টা সরকারে দ্বায়িত্বে থাকা কর্তাদের নিকট।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রাস্তায় গাড়ির চাপ ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও ডাম্পিং করা হচ্ছে, তবে চালক ও মালিকদের অসচেতনতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কেবল রাস্তা বাড়িয়ে ঢাকার যানজট কমানো সম্ভব নয়, বরং মানসম্মত গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে ঢাকাকে সচল করার উদ্যোগ নিতে হবে।