গুইমারা সহিংসতা: ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক, শান্তি ফিরে আসুক পাহাড়ে

খাগড়াছড়ি সদরের সিঙ্গিনালা এলাকায় এক কিশোরী মারমা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুইমারায় যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তা দেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। পাহাড়ের মানুষ বহুদিন ধরেই নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জটিলতার মুখোমুখি। সেখানে আবার যৌন সহিংসতার মতো নৃশংস ঘটনা এবং তার প্রেক্ষিতে প্রাণহানির মতো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন তোলে, আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?
ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর ন্যায়বিচারের দাবিতে জনগণের ক্ষোভ-প্রতিবাদ স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্ষোভ যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। গুইমারায় তিন তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন, বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের জন্য ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের ঘোষণা দেওয়া হলেও যে ক্ষতি ইতোমধ্যেই হয়েছে, তার পূর্ণ প্রতিকার সম্ভব নয়।
এই প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসনের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, শুধু কমিটি গঠন করলেই যথেষ্ট নয়। অতীতে বহু তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অন্ধকারে চাপা পড়ে গেছে। ফলে জনগণের মধ্যে আস্থা ফেরাতে হলে তদন্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অপরাধী যেই হোক, তার পরিচয়, অবস্থান বা প্রভাব যাই থাকুক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
এছাড়া ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। ধর্ষণের ঘটনায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দমনে প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ও টানাপোড়েনে শিক্ষা, অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। পাহাড়ের মতো সংবেদনশীল এলাকায় এ ধরনের পরিস্থিতি আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু কঠোরতা নয়, বরং আস্থা ফিরিয়ে আনা।
আমরা মনে করি, গুইমারার এই সহিংসতা পাহাড়ের দীর্ঘদিনের অনিরসনীয় সমস্যার আরেকটি বহিঃপ্রকাশ। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি দিন দিন তীব্র হচ্ছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, অপরাধ দমন করা এবং সামাজিক সংহতি ফিরিয়ে আনা ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
সুতরাং আজ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনটি বিষয়:
১. ধর্ষণ মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
২. গুইমারায় সহিংসতায় নিহত ও আহতদের ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন।
৩. পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং জনগণের আস্থা ফেরানো।
দেশের কোনো নাগরিক যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, এটা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। খাগড়াছড়ির কিশোরী, নিহত তিন যুবক কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সবার জন্যই সমানভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হোক। পাহাড়ে শান্তি ফিরুক, সহাবস্থানের সংস্কৃতি দৃঢ় হোক, এটিই আজ সময়ের দাবি।