গণপূর্তে দুর্নীতির মহারাজা; দুদকের তদন্ত ধামাচাপা দিয়ে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়

বাংলাদেশে দুর্নীতি শব্দটি উচ্চারণ করলে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রথম সারিতে আসে, তার মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর অন্যতম। এই দপ্তরের চাকরি মানে সোনার হরিণ, এমন ধারণা জনমনে বহুকাল ধরেই প্রচলিত। পিয়ন থেকে শুরু করে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত প্রায় সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হলেও এক অদৃশ্য ক্ষমতার কারণে অধিকাংশ কর্মকর্তাই রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এমনই এক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) মো. ফজলুল হক মধু। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দপ্তরে ‘হরিলুটের রাজত্ব’ কায়েম করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জি কে শামীম থেকে শুরু করে বড় বড় মাফিয়া চক্র ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছিল তার সখ্যতা। এ প্রভাব খাটিয়েই তিনি হয়ে উঠেছেন শত কোটি টাকার মালিক।
নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায়ই ফজলুল হক মধুর বিরুদ্ধে ভূয়া বিল উত্তোলন, টেন্ডার বাণিজ্য, সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের কাছে কাজ দেওয়ার শর্তে কমিশন গ্রহণ, কাজ না করলেও বিল প্রদান, অগ্রিম বিল প্রদান, এমনকি অধীনস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে। একাধিক প্রকৌশলী দাবি করেছেন, তিনি কাজের অগ্রগতি ছাড়াই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল প্রদান করেছেন।
একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, বর্তমানেও তার নেতৃত্বে গণপূর্তের উন্নয়ন শাখায় অনিয়ম ও দুর্নীতির মহোৎসব চলছে, যার মূল কমিশন নিজেই ভোগ করছেন মধু।
কাজ সম্পন্ন না করেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে তিনি দপ্তর থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বিল প্রদান করেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাকে প্রোমোশন দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদায়ন করা হয়েছে।
গণপূর্তের আওতাধীন আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে জালিয়াতির মাধ্যমে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল প্রদান করা হয়। বিষয়টি উন্মোচিত হলেও দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা, তদন্ত কমিটি বা শোকজ পর্যন্ত করা হয়নি। বরং বিভিন্ন অযৌক্তিক কমিটি গঠন ও কাগজপত্র চালাচালির মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ করে গুরুতর অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
জি কে শামীম গ্রেপ্তারের পর ফজলুল হক মধুর নাম আলোচনায় আসে। তখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিষয়ে তদন্ত শুরু করলেও রহস্যজনক কারণে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
দীর্ঘদিন গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন দপ্তরে চাকরির সুবাদে ফজলুল হক মধু রামপুরা, বনশ্রী, গুলশান ও মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লট, ফ্ল্যাট ও অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। নিকটস্থ সূত্র জানিয়েছে, তার স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়স্বজনের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৩০ কোটি টাকার এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে। সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকারও বেশি।
এতসব অভিযোগ ও দুর্নীতির পরও ফজলুল হক মধু বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন এবং পাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি। ফলে গণপূর্ত অধিদপ্তরে দীর্ঘদিনের সৎ কর্মকর্তারা উপেক্ষিত ও নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
তার সম্পদের পরিমাণ ও বিস্তারিত অনিয়ম নিয়ে আগামী পর্বে আরও বিস্তৃত তথ্য প্রকাশ করা হবে।