জলবায়ু পরিবর্তনে বাস্তুচ্যুতি দীর্ঘস্থায়ী সংকট, বাড়ছে অদৃশ্য ক্ষতও

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি এখন আর সাময়িক সংকট নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকটে প্রতিবছরই ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। বাস্তুচ্যুতির ফলে জমি, ফসল কিংবা গবাদিপশুর মতো দৃশ্যমান সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে এমন কিছু ক্ষত, যার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন। সামাজিক সম্পর্ক হারানো, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসিক ট্রমা—সব মিলিয়ে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।
আইএমও ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে দেশে দুর্যোগের কারণে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় ছিলেন। তাঁদের প্রায় ৬০ শতাংশই ২০২০ সালের এপ্রিলের আগে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অর্থাৎ, অনেক মানুষের জন্য বাস্তুচ্যুতি সাময়িক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত জীবনযাপনের অংশ।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ সতর্ক করা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির সংকট ও কৃষি উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারেন।
দেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও নদীতীরবর্তী জনপদে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি নদীভাঙন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং সুপেয় পানির সংকট অনেক পরিবারকে বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য করছে। ‘ফুড সিকিউরিটি নেটওয়ার্ক (খান)’ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণায়ও অভ্যন্তরীণ জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২০ সালের এক মূল্যায়নে এ ধরনের বাস্তুচ্যুতির কারণে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল।
দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরে অদৃশ্য যন্ত্রণা
বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ শুধু ঘরবাড়ি বা সম্পদ হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নতুন এলাকায় গিয়ে বাসস্থান, কাজ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকের জমির দলিল বা জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে নতুন পরিবেশে টিকে থাকার সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে নারী, শিশু ও কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। নিরাপত্তাহীনতা, আর্থিক অনটন ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব তাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলে। বাস্তুচ্যুতির কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পরিচিত পরিবেশ, বন্ধু ও সামাজিক সম্পর্ক হারিয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ।
অন্যদিকে, নতুন এলাকায় গিয়ে পুরোনো সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ হারানোর বেদনাও অনেকের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এসব অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধারণত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব বা পুনর্বাসন পরিকল্পনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
নীতিমালা আছে, বাস্তবায়নে ঘাটতি
বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) এবং জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিভিন্ন নীতিমালায় বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এখনো ধীরগতির বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বাস্তুচ্যুত অনেক পরিবার নিয়মিত খাদ্যসহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জীবিকা হারানোর পর নতুন এলাকায় কাজ না পেয়ে অনেকে ঋণ বা ধারদেনার ওপর নির্ভর করছেন। উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ার কারণে তাঁদের আর্থিক সংকট আরও বাড়ছে। ফলে একবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর অনেক পরিবার দীর্ঘদিন দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার চক্র থেকে বের হতে পারছে না।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা ত্রাণ বিতরণ যথেষ্ট নয়। বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা। এতে স্থায়ী ও নিরাপদ আবাসনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিচয় ও অধিকার নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। জমির দলিল বা স্থায়ী ঠিকানা না থাকলেও যেন তাঁরা প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পান, সে ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও পুনর্বাসন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই বড় সামাজিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এই সংকট মোকাবিলায় শুধু ঘরবাড়ি নির্মাণ বা আর্থিক সহায়তা নয়, মানুষের হারানো জীবিকা, সামাজিক বন্ধন ও মানসিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও জরুরি। তা না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি শুধু উপকূলীয় জনপদেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করবে।