পানি, খাবার আর স্বজন হারানোর বেদনায় গাজাবাসীর দিন

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চতুর্থ বছরে গড়িয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবন এখন খাবার ও পানি সংগ্রহ, বাস্তুচ্যুতি এবং স্বজন হারানোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
পশ্চিম গাজা সিটিতে ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত একটি স্কুলে দুই বছর ধরে আশ্রয় নিয়ে আছেন রজা আল-শাওয়িশ। ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের সময় নিখোঁজ হন তাঁর স্বামী মুহাম্মদ। এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনারা তাকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। তিনি রাজি না হওয়ায় তাকে মারধর করা হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
রজা জানান, তিনি রেড ক্রস ও ইসরায়েলভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হা মোকেদ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেও স্বামীর সন্ধান পাননি। তবে এখনও তিনি বিশ্বাস করেন, তার স্বামী বেঁচে আছেন এবং বন্দি অবস্থায় আছেন।
স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর সন্তানদের দেখাশোনা ও খাবারের ব্যবস্থা একাই করতে হচ্ছে রজাকে। চরম সংকটের সময়ে সন্তানদের খাবার জোগাতে নিজের প্রায় সব সোনা বিক্রি করেছেন তিনি। শেষ টুকরোটি রেখে দিয়েছেন স্বামী ফিরে এলে আনন্দ উদযাপনের জন্য।

রজা বলেন, ‘আমার জীবন হারিয়ে গেছে। আমি নিজেকে আর নারী হিসেবে দেখতে পারি না।’ যুদ্ধের আগে নিজের সাজগোজ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন স্বামী ও ভালোবাসার মানুষটি না থাকায় নিজের জন্য সাজগোজ করারও কোনো অর্থ খুঁজে পান না।
দুই বছর ধরে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় থাকা রজা সম্প্রতি মেয়ের বিয়েতে রাজি হয়েছেন। অক্টোবরের শেষ দিকে বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে। তার আশা, তার আগেই হয়তো স্বামী ফিরে আসবেন।
তবে শুধু রজার পরিবার নয়, পুরো গাজার সামাজিক জীবনই বদলে গেছে বলে তিনি মনে করেন। দীর্ঘ বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য, গাদাগাদি করে বসবাস এবং অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের মধ্যে বিরক্তি ও দ্বন্দ্ব বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
গাজাবাসীর দিনের বড় একটি অংশ এখন পানি ও খাবার সংগ্রহেই কেটে যাচ্ছে। ৩৬ বছর বয়সী পাঁচ সন্তানের বাবা নিহাদ আল-স্কাফি ভোরে উঠে পানির লাইনে দাঁড়ান। তিনি বলেন, ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত তাদের সময় কাটে পানি জোগাড়, খাবার খোঁজা, রান্না ও বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় কাজেই।
স্কাফি জানান, গোসল ও ধোয়া-মোছার জন্য এক ধরনের পানি পাওয়া গেলেও খাওয়ার পানির জন্য এক দিন পরপর ট্যাংকারের অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। যুদ্ধের আগে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও এখন পরিবারকে খাওয়াতে তাকে ত্রাণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
রান্নার গ্যাসের সংকটও তাদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। গ্যাসের জন্য পরিবারগুলোকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে কাঠ বা খড়ি ব্যবহার করছেন।
বিদ্যুতের সংকটও গাজাবাসীর জীবনের আরেক বড় সমস্যা। বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির কারণে অনেকে জেনারেটর বা সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করছেন। যাদের সে সুযোগ নেই, তারা টাকা দিয়ে ছোট চার্জিং পয়েন্টে মোবাইল ফোন চার্জ করছেন।

৩৪ বছর বয়সী হিলাল আল-জুওয়াইদি এমনই একটি চার্জিং পয়েন্ট চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। যুদ্ধের আগে নির্মাণ ও ফলের ব্যবসা করলেও এখন ফোন চার্জ দেওয়াই তার আয়ের উৎস। তিনি জানান, প্রতি ফোন চার্জে এক থেকে দুই শেকেল নেন। তবে অনেক পরিবার অর্থের সংকটে বাকিতে ফোন চার্জ করায় তার কাছেও ঋণ জমছে।
জুওয়াইদি বলেন, যুদ্ধের আগে এমন চার্জিং পয়েন্টের প্রয়োজনই ছিল না। এখন মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজন থেকেই নতুন এই কাজের সৃষ্টি হয়েছে।
গাজার মানুষের এই অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি থাকলেও সেখানে স্বাভাবিক জীবন এখনো ফেরেনি। খাবার, পানি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই প্রতিদিন তাদের বড় ধরনের সংগ্রাম করতে হচ্ছে।