যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি থেকে সরে গেল কানাডা, চুক্তি প্রত্যাখ্যানে কী প্রতিক্রিয়া?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করার বদলে আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কানাডা। দীর্ঘদিনের দুই মিত্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য বিরোধের প্রেক্ষাপটে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির এই সিদ্ধান্তকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে একটি সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে শেষ মুহূর্তে বিভিন্ন শর্ত নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে আলোচনা ভেস্তে যায়। দুই পক্ষই এর জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত কিছু দাবি করেছে, কিন্তু বিনিময়ে পর্যাপ্ত ছাড় দিতে রাজি হয়নি। তাঁর ভাষায়, প্রস্তাবিত কিছু শর্ত ছিল ‘অন্যায্য’ ও ‘অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক’।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জামিসন গ্রিয়ার অভিযোগ করেছেন, কানাডা আলোচনার শেষ পর্যায়ে নতুন দাবি তুলেছে এবং আগে দেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতি থেকেও সরে এসেছে।
‘কানাডার ওপর হামলা হয়েছে’
বাণিজ্য বিরোধ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কার্নি বলেন, কানাডা এই সংঘাত শুরু করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও চাপের কারণে দেশটি পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আপনার ওপর হামলা হলে তবেই আপনি যুদ্ধে আছেন—আমাদের ওপর হামলা হয়েছে।’
ফরাসি ভাষায়ও কানাডার অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, চলমান বাণিজ্য বিরোধ তাদের ইচ্ছায় শুরু হয়নি। একই সঙ্গে কানাডা শক্তিশালী, প্রস্তুত এবং ঐক্যবদ্ধ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধের কারণে দুই দেশের অর্থনীতিতেই চাপ বাড়তে পারে। কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভর। আবার যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের জন্য কানাডা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার।
মিশিগান, কেনটাকি, ইন্ডিয়ানা ও ওহাইওর মতো অঙ্গরাজ্যগুলো কানাডার পাল্টা ব্যবস্থার কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রতিবাদে কানাডীয়দের একটি অংশ ইতিমধ্যে মার্কিন পণ্য ও পর্যটন এড়িয়ে চলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন ও মদ শিল্পেও।
মার্কিন বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইন রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে মার্কিন মদ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে মার্কিন স্পিরিটস শিল্পও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কার্নির ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন কার্নি। তাই এখন আলোচনার টেবিল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে কানাডীয়দের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপেও কানাডীয়দের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের বিরুদ্ধে কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। ফলে সরকারের বর্তমান অবস্থানকে জনসমর্থনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও মনে করা হচ্ছে।
কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের নেতারাও আপাতত প্রধানমন্ত্রীর পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবি জাতীয় স্বার্থে সরকারের সঙ্গে থাকার কথা জানিয়েছেন। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডও বলেছেন, কানাডা এই লড়াই শুরু করেনি, তবে শেষ পর্যন্ত জয়ী হওয়ার জন্য প্রস্তুত।
শেষ মুহূর্তে কেন ভেঙে গেল আলোচনা?
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গাড়ি শিল্প ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শর্ত নিয়ে আপত্তি তৈরি হয়।
কার্নির মতে, এসব শর্ত মেনে নিলে ভবিষ্যতে কানাডার জন্য চুক্তিটির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতো।
অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, কানাডাই আলোচনার শেষ পর্যায়ে নতুন কিছু দাবি তুলেছে। কানাডার প্রদেশগুলো মার্কিন স্পিরিটস পণ্য আবার দোকানে ফেরানোর সিদ্ধান্ত না নেওয়াকেও আলোচনার অচলাবস্থার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
কানাডীয় গণমাধ্যমে এমন খবরও এসেছে যে, সম্ভাব্য চুক্তির কিছু বিষয় নিয়ে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকও সন্তুষ্ট ছিলেন না।
সামনে কী?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) পর্যালোচনাও সামনে রয়েছে।
কার্নির সরকারকে এখন একদিকে দেশের শিল্প ও ব্যবসাকে শুল্কের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য সম্পর্কও বিবেচনায় রাখতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কানাডার এই কঠোর অবস্থানের জবাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কী পদক্ষেপ নেন। ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়।