আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র আইনজীবীর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে এবং সংস্থাটির সিনিয়র আইনজীবী আবদুলায়ে সেয়ের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ ঘোষণা দেন। আইসিসির কার্যক্রম নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের বিরোধিতার মধ্যেই নতুন এই পদক্ষেপ সামনে এলো।
রুবিওর অভিযোগ, আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র আইনজীবী এমন কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন, যাদের দেশ আদালতের এখতিয়ার স্বীকার করে না। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আইসিসি তার নির্ধারিত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে কাজ করছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইসিসিকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ ও ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত’ আদালত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ওয়াশিংটন মেনে নেবে না।
তবে আইসিসি বলেছে, তারা তাদের বিচারক, প্রসিকিউটর ও কর্মীদের পাশে রয়েছে। আদালতের মতে, বিচারিক কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগের কারণে নিষেধাজ্ঞা বা হুমকির মুখে পড়লে আন্তর্জাতিক আইনের শাসনই দুর্বল হয়ে পড়ে।
ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে আইসিসির অন্তত ১১ জন কর্মকর্তা ও বিচারকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন নয়জন বিচারক ও প্রধান প্রসিকিউটর। নিষেধাজ্ঞার আওতায় সম্পদ জব্দ, ভ্রমণে বিধিনিষেধ এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সেবা গ্রহণে বাধা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ রয়েছে।
আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসির তদন্ত এবং গাজায় সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আদালতের বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।
নেতানিয়াহু তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি আইসিসির বিরুদ্ধে পক্ষপাত ও ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগও তুলেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—দুই দেশই আইসিসির সদস্য নয়।
ফিলিস্তিন ২০১৫ সালে আইসিসির সদস্য হয়। এর ফলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের তদন্তের এখতিয়ার আদালতের সামনে তৈরি হয়।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডে সংঘটিত গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করার জন্য গঠিত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো পরিস্থিতি আদালতে পাঠালেও আইসিসি সেটি তদন্ত করতে পারে।
আইসিসির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নতুন নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদেই যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছিল এবং ওয়াশিংটনের ওপর আদালতের কোনো এখতিয়ার বা বৈধতা নেই বলে দাবি করা হয়েছিল।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প প্রশাসন আদালটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত মাসে মার্কো রুবিও আইসিসির ১২৫ সদস্য রাষ্ট্রকে আদালটি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগকে আইসিসির কার্যক্রম দুর্বল করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে এবং কোন দেশ দিচ্ছে না, তা ওয়াশিংটন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করবে।
আইসিসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করার পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ কয়েকটি মার্কিন মানবাধিকার সংগঠন আইসিসির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেছে। সংগঠনগুলোর দাবি, নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইসিসির সঙ্গে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আন্তর্জাতিক বিচার বিষয়ক পরিচালক লিজ এভেনসন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ বিভিন্ন সরকারের দায়মুক্তির সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারে।
এর আগে জুনে আইসিসির তিন বিচারকও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করেন। তাঁদের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে করা মামলায় বিচারকেরা বলেন, এসব পদক্ষেপ বিচারকদের ওপর রাজনৈতিক ও বিচারবহির্ভূত চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
কানাডার বিচারক কিম্বারলি প্রস্ট, উগান্ডার সোলোমন বালুঙ্গি বোসা ও বেনিনের রেইন আলাপিনি-গানসু দাবি করেন, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তাদের নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর আইনগত ক্ষমতার মধ্যেই কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক থাকা ব্যাংকগুলো সাধারণত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলায় এসব পদক্ষেপ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে আইসিসির বিরুদ্ধে মার্কিন চাপ আরও জোরালো হয়েছে। জুলাইয়ে আদালটিকে বিলুপ্ত করার প্রচারণা চালানোর ঘোষণা দিয়ে মার্কো রুবিও অভিযোগ করেন, আইসিসি আন্তর্জাতিক আইন ও বিভিন্ন চুক্তির ক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কার্যত অবস্থান নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও আইনি ব্যবস্থার জন্য হুমকি তৈরি করছে এবং দেশটির সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে ওয়াশিংটন কঠোরভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র আইনজীবীর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও আইসিসির দীর্ঘদিনের বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।