সওজের গাড়িচালকের স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের নামে দেড় কোটি টাকার কাজ

মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের এক গাড়িচালকের স্ত্রীর মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার সরকারি কাজ বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট গাড়িচালক নিজ কর্মস্থলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি কাজ পেতে স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহার করেছেন। বিষয়টি সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, সওজের গাড়িচালক মিরাজের স্ত্রী মোসা. সুলতানা খাতুনের মালিকানাধীন ‘এসএম হিম এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নামে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়ক এবং ধামরাই-কালামপুর লিংক রোডের তিনটি প্যাকেজে মোট প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
চাকরির পাশাপাশি স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরাজ ২০১৫ সালে মানিকগঞ্জ সওজ বিভাগে অস্থায়ী গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন। তার বাবা আব্দুল লতিফও একই বিভাগের গাড়িচালক ছিলেন। তিনি অবসরে যাওয়ার পর মিরাজ অস্থায়ীভাবে চাকরিতে যোগ দেন।
অভিযোগ রয়েছে, সওজে কর্মরত থাকার সময়ই মিরাজ স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং নিজ কর্মস্থলের আওতাধীন সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। সরকারি নথিতেও ‘এসএম হিম এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী হিসেবে মিরাজের স্ত্রী সুলতানা খাতুনের নাম রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচালনা ও সরকারি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে মিরাজের কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কাজ পাওয়ার পর অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রির অভিযোগ
আরও অভিযোগ রয়েছে, স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ পাওয়ার পর তা নিজেরা বাস্তবায়ন না করে অন্য ঠিকাদারের কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করে দেওয়া হয়। মিরাজ নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স থাকলেও তখন তিনি স্থায়ী চাকরিতে ছিলেন না। কাজটি তাদের প্রতিষ্ঠান করেনি; রাজিব নামের এক ব্যক্তির কাছে সেটি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি কাজ এভাবে অন্যের কাছে হস্তান্তরের বৈধতা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিধি নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনায় সরকারি কর্মচারীর ব্যক্তিগত ব্যবসা এবং নিজ কর্মস্থলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি কার্যক্রমে অংশগ্রহণের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। সরকারি কর্মচারী নিজে বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে কর্মস্থলের আওতাধীন কাজে যুক্ত হলে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি সামনে আসে।
অভিযোগ সত্য হলে মিরাজ সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজের কর্মস্থলের অধীন সরকারি কাজ পাইয়ে দিয়েছেন কি না, সেটি তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মকর্তার বক্তব্য
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এম এম হানিফ বলেন, মিরাজের স্ত্রী ব্যবসা করেন—এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। ব্যবসা করা বৈধ হলেও সরকারি বিধিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলে ভবিষ্যতে তিনি এ ধরনের ব্যবসা করতে পারবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘সরকারি আইনে নিষেধ থাকলে এখন থেকে সে আর কোনো ব্যবসা করবে না। আমি সরকারের এই আইন জানি না।’
তদন্তের সুযোগ আছে: দুদক
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী চাকরিরত অবস্থায় নিজের পরিচয় গোপন করে প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলে তা অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে দুদক বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত করতে পারে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ফলে সওজের গাড়িচালকের স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি কাজ বরাদ্দ, কাজ অন্য ঠিকাদারের কাছে হস্তান্তর এবং পুরো প্রক্রিয়ায় মিরাজের ভূমিকা—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। তদন্তেই নির্ধারিত হবে, সরকারি বিধি লঙ্ঘন বা কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছে কি না।