সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক চুক্তি, কেন বাড়ছে বিতর্ক?

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ না হওয়ায় এর প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি একটি "শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি", যার পাশাপাশি একটি দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে। দুই দেশের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তি আগামী কয়েক দশকের জন্য বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের আইনি ভিত্তি তৈরি করবে।
কী বলছে যুক্তরাষ্ট্র?
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এই সহযোগিতা পারমাণবিক নিরাপত্তা, অস্ত্র বিস্তার রোধ এবং বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।
জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, চুক্তিতে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
সৌদি আরবের বক্তব্য
সৌদি সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন চুক্তিটি দুই দেশের বিদ্যমান জ্বালানি সহযোগিতার সম্প্রসারণ। গত নভেম্বরে সৌদি নেতৃত্বের ওয়াশিংটন সফরের ধারাবাহিকতায় এ সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে।
কেন বাড়ছে উদ্বেগ?
চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ না হলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও একই প্রযুক্তি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে এটি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মত
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেন, যদি চুক্তিতে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে নজিরবিহীন পরিবর্তন হবে।
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এর আগে কোনো দেশকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করেনি। কারণ এতে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ইসরায়েলের উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের সাবেক পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকে এগিয়ে নিতে পারে।
তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এমন সক্ষমতা অর্জনে সৌদি আরবের এখনও দীর্ঘ সময় লাগবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে হবে।
কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন
চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে মার্কিন কংগ্রেসে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করবে না, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা, ইয়েমেনে হুথিদের তৎপরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান নিরাপত্তা সংকটের মধ্যেই এই চুক্তি স্বাক্ষর হলো। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।