বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

প্রযুক্তি ও ই-কমার্সে অ্যামাজনের আধিপত্যের রহস্য

প্রযুক্তি ও ই-কমার্সে অ্যামাজনের আধিপত্যের রহস্য
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আজকের দিনে ইন্টারনেটে কেনাকাটার কথা উঠলেই যে নামটি সবার আগে মাথায় আসে, সেটি হলো ‘অ্যামাজন’। ঘরের সুঁই-সুতো থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্স— সবকিছুই এক ক্লিকে দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে এই মার্কিন ই-কমার্স জায়ান্ট। তবে আজকের এই ট্রিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য কিন্তু রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। ১৯৯৪ সালে একটি গ্যারেজ থেকে শুরু হওয়া ছোট্ট একটি অনলাইন বইয়ের দোকান কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিটেইল চেইন ও প্রযুক্তির মুকুটহীন সম্রাটে পরিণত হলো, তা যেকোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের গল্পকেও হার মানায়। জেফ বেজোসের দূরদর্শিতা আর কঠোর ব্যবসায়িক কৌশলের ওপর ভর করে অ্যামাজনের শূন্য থেকে শীর্ষে পৌঁছানোর সেই অবিশ্বাস্য আদ্যোপান্ত নিচে তুলে ধরা হলো।

গ্যারেজ থেকে শুরু: শুধু বই বিক্রির উদ্যোগ

অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস আশির দশকের শেষে ওয়াল স্ট্রিটের একটি নামী সংস্থায় বেশ ভালো বেতনে চাকরি করতেন। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি লক্ষ্য করেন, ইন্টারনেটের ব্যবহার প্রতি বছর প্রায় ২,৩০০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মতো বড় ঝুঁকি নেন। ১৯৯৪ সালের ৫ জুলাই ওয়াশিংটনের বেলভিউতে নিজের বাড়ির গ্যারেজে মাত্র কয়েকজন কর্মী নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘অ্যামাজন’। শুরুতে এর নাম ‘ক্যাডাব্রা’ (Cadabra) রাখা হলেও পরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নদীর নামানুসারে এর নাম দেওয়া হয় ‘অ্যামাজন’, যার লক্ষ্য ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় পণ্যের ভাণ্ডার হওয়া। শুরুতে কোম্পানিটি কেবল অনলাইনে বই বিক্রি করত।

‘গেট বিগ ফাস্ট’ এবং গ্রাহক-কেন্দ্রিক দর্শন

জেফ বেজোসের মূল মন্ত্র ছিল ‘গেট বিগ ফাস্ট’ (Get Big Fast) অর্থাৎ দ্রুত ব্যবসার পরিধি বাড়ানো এবং মুনাফার চিন্তা না করে লভ্যাংশের পুরোটা আবার ব্যবসার প্রসারে বিনিয়োগ করা। দীর্ঘ দিন যাবৎ অ্যামাজন কোনো লভ্যাংশ (Profit) করতে পারেনি, যার কারণে অনেক বিশ্লেষকই কোম্পানিটির দেউলিয়া হওয়ার ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। কিন্তু বেজোস দমে যাননি। তিনি গ্রাহকদের অভিজ্ঞতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন। কম দামে পণ্য দেওয়া, দ্রুত ডেলিভারি এবং নিখুঁত কাস্টমার সার্ভিসের কারণে অ্যামাজন খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে। ১৯৯৮ সাল থেকে বইয়ের পাশাপাশি সিডি, ডিভিডি, খেলনা এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্য বিক্রি শুরু করে কোম্পানিটি।

ডট-কম ক্র্যাশ ও ঘুরে দাঁড়ানো

২০০০ সালের দিকে বৈশ্বিক প্রযুক্তির বাজারে ধস নামে, যা ‘ডট-কম বাবল ক্র্যাশ’ (Dot-com crash) নামে পরিচিত। এই ধসে অনেক বড় বড় ইন্টারনেটভিত্তিক কোম্পানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। অ্যামাজনের শেয়ারের দামও হু হু করে পড়ে যায়। তবে শক্তিশালী ব্যবসায়িক ভিত্তি এবং গ্রাহক বিশ্বাসের ওপর ভর করে অ্যামাজন সেই কঠিন দুর্যোগ কাটিয়ে শুধু টিকেই থাকেনি, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে বাজারে কামব্যাক করে।

গেম চেঞ্জার: ‘অ্যামাজন প্রাইম’ এবং ‘এডব্লিউএস’

অ্যামাজনের ইতিহাসে দুটি সিদ্ধান্ত গেম চেঞ্জার হিসেবে কাজ করেছে:

১. অ্যামাজন প্রাইম (Amazon Prime): ২০০৫ সালে চালু হওয়া এই সাবস্ক্রিপশন সেবার মাধ্যমে গ্রাহকদের মাত্র দুই দিনে ফ্রি হোম ডেলিভারির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এটি গ্রাহকদের অ্যামাজনের ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল করে তোলে।

২. অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (AWS): কেবল পণ্য বিক্রিতেই আটকে না থেকে ২০০৬ সালে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের দুনিয়ায় পা রাখে অ্যামাজন। আজ বিশ্বের বড় বড় ওয়েবসাইট ও অ্যাপ চলে এই AWS-এর ওপর ভর করে, যা বর্তমানে অ্যামাজনের আয়ের সবচেয়ে বড় এবং লাভজনক উৎস।

বর্তমানের ট্রিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য

আজকের অ্যামাজন কেবল ই-কমার্স সাইট নয়; এর রয়েছে নিজস্ব স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম (Prime Video), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ডিভাইস (Alexa), বিশাল লজিস্টিকস চেইন এবং নিজস্ব কার্গো বিমান। বিশ্বজুড়ে কোম্পানিটির কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের ওপরে। জেফ বেজোস নির্বাহী প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও অ্যান্ডি জেসির নেতৃত্বে অ্যামাজনের আধিপত্য দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

শূন্য থেকে শুরু করে বিশ্ববাণিজ্যের শীর্ষে পৌঁছানোর এই গল্প এটাই প্রমাণ করে যে, সঠিক দূরদর্শিতা, গ্রাহকের প্রতি সততা এবং ক্রমাগত নিজেকে বদলে নেওয়ার মানসিকতা থাকলে যেকোনো ছোট উদ্যোগই একদিন বিশ্ব জয় করতে পারে।


দৈএনকে/জে, আ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন