বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

২০০৫ সালের স্বপ্ন, ২০২৫-এ ফিরে এল ইনবক্সে

২০০৫ সালের স্বপ্ন, ২০২৫-এ ফিরে এল ইনবক্সে
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের যুগে অনেক কিছুই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়। কিন্তু এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ প্রমাণ করল—প্রযুক্তির চেয়ে মানুষের সম্পর্কই কখনো কখনো বেশি স্থায়ী। ২০০৫ সালে শুরু হওয়া একটি ‘ইমেইল টাইম ক্যাপসুল’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ দুই দশক পর নিজেদের অতীত সত্তার কাছ থেকে ইমেইল পেয়েছেন।

তৎকালীন ফোর্বস ম্যাগাজিনে কর্মরত এক সাংবাদিকের উদ্যোগে প্রকল্পটির সূচনা হয়। সে সময় ইন্টারনেটভিত্তিক সাংবাদিকতা ছিল তুলনামূলক নতুন এবং ওয়েবসাইটকে অনেকেই মূল প্রকাশনার গৌণ অংশ হিসেবে দেখতেন। এই প্রেক্ষাপটে যোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরির সময় নতুন ধরনের একটি ধারণা সামনে আসে—ভবিষ্যতের নিজের কাছে ইমেইল পাঠানোর সুযোগ।

এই ধারণা থেকেই তৈরি করা হয় একটি অনলাইন টুল, যেখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের উদ্দেশে একটি ইমেইল লিখে নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করতে পারতেন। এক, তিন, পাঁচ, দশ কিংবা কুড়ি বছর পর সেই ইমেইল পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল। প্রকল্পটি উন্মুক্ত করার পর লাখো মানুষ এতে অংশ নেয়।

তবে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ছিল বড়। এতগুলো ইমেইল দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত সময়ে পাঠানো নিশ্চিত করতে তিনটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে প্রোগ্রাম চালু করা হয়—ফোর্বস ম্যাগাজিন, ইন্টারনেট জায়ান্ট ইয়াহু এবং একটি ছোট আইটি কোম্পানি কোডফিক্স কনসালটিং।

পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি সার্ভারে ইমেইলের কপি রাখা হয়, যাতে কোনো একটি সিস্টেম নষ্ট হলেও অন্যটি দায়িত্ব নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে প্রকল্পটি নানা বাধার মুখে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই ইয়াহুতে কর্মী ছাঁটাই শুরু হয় এবং সেখানকার সিস্টেমটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরে ফোর্বস ম্যাগাজিনও মালিকানা পরিবর্তনের কারণে তাদের ডিজিটাল অবকাঠামো বদলে ফেলে।

শেষ পর্যন্ত পুরো প্রকল্পটি টিকিয়ে রাখেন কোডফিক্স কনসালটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা গ্যারিসন হফম্যান। তিনি একাই প্রথম বছর, তৃতীয় বছর এবং পঞ্চম বছরে নির্ধারিত ইমেইলগুলো পাঠানোর দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু প্রকল্পটি আবারও ধাক্কা খায় যখন গ্যারিসন হফম্যান মাত্র ৪৬ বছর বয়সে হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন। তবুও তিনি আগেভাগেই সব প্রযুক্তিগত তথ্য ও কোডের ব্যাকআপ রেখে গিয়েছিলেন, যাতে প্রয়োজনে অন্যরা কাজটি চালিয়ে যেতে পারেন।

দুই দশক পূর্ণ হওয়ার সময় সেই ব্যাকআপ ব্যবহার করে আবারও ইমেইলগুলো পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ফলে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ তাদের ২০ বছর আগের লেখা বার্তা ফিরে পান—যা ছিল তাদের অতীতের স্বপ্ন, আশা ও পরিকল্পনার স্মৃতি।

এই অভিজ্ঞতা প্রকল্পটির উদ্যোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে এসেছে। তাদের মতে, প্রযুক্তি নয়, বরং মানুষের আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাই এই টাইম ক্যাপসুলকে টিকিয়ে রেখেছে।

এদিকে, ফোর্বস ম্যাগাজিনের সেই সময়কার মূল অনলাইন প্রতিবেদনের ওয়েবপেজ এখন প্রায় অকার্যকর—অনেক লিংক ও ছবি হারিয়ে গেছে। তবে মানুষের লেখা সেই ইমেইলগুলো এখনো জীবন্ত স্মৃতির মতো টিকে আছে।

বিশ বছর পর নিজের কাছ থেকে পাওয়া একটি ইমেইলের বিষয়বস্তু ছিল খুবই সরল: “আরেব্বাস, এটা তো সত্যিই কাজ করছে!”

এই প্রকল্পটি প্রমাণ করে—ডিজিটাল যুগেও মানুষের সম্পর্ক এবং দায়িত্ববোধই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।


দৈএনকে/জে, আ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন