মাইগ্রেইন ডিসঅর্ডার: মাথাব্যথার আড়ালে পুরো স্নায়ুতন্ত্রের প্রভাব

মাইগ্রেইন—শুধু মাথাব্যথা নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্নায়ুবিক রোগ। প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুইবার অনুভূত হয় ডান বা বাম দিকের মাথায় চাপ, চোখের পেছনে ছুরি-সদৃশ ব্যথা এবং চোয়ালে প্রসারিত বেদনাসূচক অনুভূতি। কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যথা জ্বলন, শব্দ ও চাপের সঙ্গে মিলিত হয়।
বিশ্বব্যাপী ১২ কোটি মানুষের এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল পাওয়া সম্ভব। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী রোগ। কিন্তু এত সাধারণ এবং তীব্র প্রভাব থাকা সত্ত্বেও মাইগ্রেইন এখনো রহস্যময়।
মাইগ্রেইন কী এবং কেন হয়ে থাকে?
মাইগ্রেইন সাধারণ মাথাব্যথা নয়। এটি একটি জটিল রোগ যা মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশকে প্রভাবিত করে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে “মাইগ্রেইন ডিসঅর্ডার” বলে উল্লেখ করতে বলেন। “অ্যাটাক” বলতে বোঝানো হয় রোগের প্রারম্ভিক বা তীব্র অবস্থাকে।
মাইগ্রেইনের লক্ষণগুলো ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন। কেউ নাভি বা বমি, ভার্টিগো, আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা খাদ্য-ক্রেভিং অনুভব করেন। কিছু রোগীর ২৫% ক্ষেত্রে অরা দেখা যায়—জ্যামিতিক আলো বা ঝাপসা দৃষ্টি।
ট্রিগার না লক্ষণ?
মাইগ্রেইনের ট্রিগার এবং লক্ষণকে আলাদা করা কঠিন। উদাহরণস্বরূপ, চকোলেট বা চিজ খাওয়ার ইচ্ছা কিছু রোগীর ক্ষেত্রে রোগের প্রারম্ভিক লক্ষণ হতে পারে। তাই অনেকেই ভুলবশত এটিকে ট্রিগার ভাবেন।
জেনেটিক এবং স্নায়ুবিক উপাদান
মাইগ্রেইনের জেনেটিক উপাদান রয়েছে। এটি পরিবারের মধ্যে চলে আসে এবং অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও জীবনধারার সঙ্গে জড়িত। গবেষকরা লক্ষ করেছেন, ৩০-৬০% রোগীর ক্ষেত্রে জেনেটিক উপাদান প্রভাবশালী।
মাইগ্রেইনের ক্ষেত্রে রক্তনালীর ভ্রান্ত সংকোচনও লক্ষ্য করা যায়। তবে রক্তপ্রবাহের মাত্রাই দায়ী নয়। বরং, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক সক্রিয়তা এবং ট্রিগেমিনাল গ্যাংলিয়া ও মেনিনজেসের প্রদাহ জটিলতাকে বাড়ায়।

মাইগ্রেইনের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি
মাইগ্রেইনের সময় মস্তিষ্কে “কোর্টিকাল স্প্রেডিং ডিপ্রেশন” নামে একটি ধীর বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। এটি স্নায়ু সক্রিয়তা হ্রাস করে, প্রদাহ ও ব্যথা সৃষ্টি করে। ২০২৫ সালে গবেষকরা একটি রোগীর মস্তিষ্কে এই তরঙ্গ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছেন।
নতুন ওষুধ ও চিকিত্সা
সম্প্রতি “CGRP” নামের নিউরোমোডুলেটরকে লক্ষ্য করে নতুন ওষুধ বাজারে এসেছে। এটি স্নায়ুর সংবেদনশীলতা কমিয়ে আক্রমণকে প্রতিরোধ করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, রোগীর ৭০%-এর অ্যাটাকের ঘনত্ব ৭৫% পর্যন্ত কমেছে, এবং ২৩% রোগী সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়েছেন।
মাইগ্রেইনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
মাইগ্রেইন প্রাপ্ত ব্যক্তি সাধারণত ২০-৫০ বছর বয়সে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন। কাজ বাদ দেওয়া, চাকরি হারানো এবং অকাল অবসর গ্রহণের সম্ভাবনা থাকে। যুক্তরাজ্যের তথ্য অনুযায়ী, একজন ৪৪ বছর বয়সী মাইগ্রেইন রোগী সরকারের জন্য বছরে প্রায় ১৯,৮২৩ পাউন্ড ($27,300) অতিরিক্ত ব্যয় করে।