রাজনীতির মঞ্চে নারী নেতার সাজপোশাকের ভাষা বদলে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া

শিফন বা জর্জেট শাড়ি, পরিপাটি চুলের বাঁধন, আঁকা ভ্রু আর বড় সানগ্লাস—নিজস্ব রুচি ও ব্যক্তিত্বের ছাপ রেখে জনসমক্ষে হাজির হতেন প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। তার এই সাজপোশাক একদিকে যেমন বহু নারীর কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছিল, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কটাক্ষের লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের উপস্থিতি ও তাদের সাজপোশাক নিয়ে যে প্রচলিত রক্ষণশীল ধারণা ছিল, তা ভেঙে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বই দেননি, বরং পশ্চিমা ও রক্ষণশীল—উভয় দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে আসার শুরুতে তাকে দেখা যেত সাদা সুতি বা তাঁতের শাড়িতে, মাথায় আধো ঘোমটা টেনে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের মাঠে দেশীয় শাড়ির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে একরঙা সিল্ক, জর্জেট বা শিফন শাড়ি তার পরিচিত অবয়বে পরিণত হয়। সীমিত অলঙ্কার, শাল, পরিমিত মেকআপ—সব মিলিয়ে তার উপস্থিতিকে অনেকেই ‘এলিগেন্ট’ ও আইকনিক বলে মনে করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন আই খান বলেন, খালেদা জিয়ার সাজপোশাক রক্ষণশীল সমাজে বিধবার যে ছকবাঁধা রূপক, তা ভেঙে দেয়। তার পোশাক ও কণ্ঠ—দুটোই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তার দৃঢ় অবস্থানের প্রতীক ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, খালেদা জিয়া পোশাকের ক্ষেত্রে কখনো উগ্র ছিলেন না; বরং তার সাজে ছিল সংযম ও সম্ভ্রম। রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও তিনি নিজের ব্যক্তিগত রুচি থেকে সরে যাননি।
তবে এই নান্দনিকতা কেবল প্রশংসাই পায়নি। সংসদ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সভা—বিভিন্ন জায়গায় তার সাজপোশাক নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়েছে। এমনকি নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা করা রাজনৈতিক দল ও নেতারাও এসব আক্রমণে অংশ নিয়েছেন।
তবুও খালেদা জিয়া এসব কটাক্ষের জবাব দেননি। নিজের পছন্দের পোশাক, আচরণ ও রাজনৈতিক অবস্থান অটুট রেখেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন তিনি। এমনকি নারী নেতৃত্বে অনাগ্রহী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোও তার নেতৃত্বে জোট গঠন করতে বাধ্য হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছিলেন—রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য নারীদের পোশাক বদলাতে হয় না, বদলাতে হয় না নিজস্বতা। তার জীবন ও রাজনীতি সেই বার্তাই রেখে গেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা