বিশ্বব্যাপী উষ্ণতার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়

বাংলাদেশ দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের হটস্পট হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান হারের কারণে দেশটি বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং মানব স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির উপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল-এ অনুষ্ঠিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উষ্ণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অপর্যাপ্ত প্রস্তুতির ফলে গরমের তীব্রতা, পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, রোগ সংক্রমণ এবং উৎপাদনশীলতার উপর নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে।
অনুষ্ঠানে পরিবেশবিদ, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতি বিশ্লেষকরা একমত হয়েছেন যে, পরিকল্পিত উদ্যোগ, জলবায়ু অভিযোজন এবং সুষ্ঠু নীতি গ্রহণ না করলে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তাদের পরামর্শ, সরকার এবং স্থানীয় সংস্থাগুলোকে উষ্ণতা মোকাবিলা, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ও দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশল গ্রহণে আরও তৎপর হতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সৈয়দুর রহমান। এ সময় বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অপারেশনস অফিসার মিস ইফফাত মাহমুদ ও সিনিয়র স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ওয়ামেক এ রাজা মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
বক্তারা বলেন, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে ‘অনুভূত তাপমাত্রা’ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
প্রতিবেদন অনুসারে, উষ্ণ আবহাওয়ার ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। রাজধানী ঢাকার হিট ইনডেক্স জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি। শুধু ২০২৪ সালেই তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এর ফলে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৪ শতাংশের সমান।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯ বছর ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ সময়। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা দেখা গেছে রাজধানী ঢাকায়। ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ঢাকার তাপমাত্রা বেড়েছে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা জাতীয় গড় বৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অপারেশনস অফিসার ইফফাত মাহমুদ বলেন, আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং উৎপাদনশীলতার হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও সঠিক বিনিয়োগের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসমে বলেন, চরম গরম কেবল মৌসুমি অসুবিধা নয়, এটি স্বাস্থ্যের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক সমৃদ্ধির জন্যও বড় হুমকি। তবে সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদন অনুসারে, মানুষ, জীবিকা ও অর্থনীতিকে ক্রমবর্ধমান তাপঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রতিবেদনের সুপারিশে রয়েছে- জাতীয় প্রস্তুতি জোরদার করা, স্বাস্থ্যসেবায় তাপজনিত রোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, শহরে সবুজায়ন বাড়ানো এবং আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সঠিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং সরকারি-বেসরকারি অর্থায়নের গুরুত্বও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।