সড়কে রক্ত ঝরছে, দায়িত্ব কে নেবে?

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন এক ভয়াবহ মহামারির রূপ নিয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গেল আগস্ট মাসে দেশে ৪৫১টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪২৮ জন, আহত হয়েছেন ৭৯১ জন। কেবল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থেকে এই ট্র্যাজেডি বোঝা যায় না—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি অসমাপ্ত জীবন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার। এক মাসে ১৪৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩২ জন চালক ও আরোহী। তরুণদের নিয়ন্ত্রণহীন গতি-প্রবণতা, সড়কে শৃঙ্খলার অভাব এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতার কারণে এই দুইচাকার যান আজ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে পথচারী নিহতের সংখ্যাও কম নয়, ৮৩ জন। অর্থাৎ, সড়ক ব্যবহারকারীদের প্রতিটি শ্রেণিই ঝুঁকির মধ্যে।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এক অস্বস্তিকর সত্য। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ট্রাফিক আইন না জানা কিংবা মানতে অনীহা, এবং সর্বোপরি দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও দায়িত্বহীনতা। ফলাফল, প্রতিদিনই নতুন করে মৃত্যু, আর ভগ্নস্বপ্নের মিছিল।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা কেবল সড়কেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সময়ে ১৯টি নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ জন এবং ৩৭টি রেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩১ জন। অর্থাৎ, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিটি খাতেই নিরাপত্তাহীনতা চরমে।
তাহলে প্রশ্ন হলো এই মৃত্যুমিছিল থামাবে কে? সমাধান কি আদৌ সম্ভব?
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হলে একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে। দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ, স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস রোড তৈরি, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি, এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ—এসবই জরুরি পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক?
সড়ক নিরাপত্তা কেবল কোনো সংস্থার দায় নয়; এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। সরকার, পরিবহন মালিক, চালক, যাত্রী—সবার সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিবহন খাত।
আজ যখন প্রতিদিন মানুষ রাস্তায় প্রাণ হারাচ্ছে, তখন আর কোনো বিলম্ব বা অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। এখনই সময় কঠোর আইন প্রয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর রোড ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিত করার।
সড়ক কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি জীবনের সেতু। আর সেই সেতুই যদি প্রতিনিয়ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তবে উন্নয়ন, অর্থনীতি, এমনকি সভ্যতার দাবিও অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ আর কত রক্ত ঝরাবে সড়কে? এখনই পদক্ষেপ নেওয়া হোক—দায়িত্বশীলভাবে, নিরপেক্ষভাবে এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারে।