বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • চলতি বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না প্রতিমন্ত্রী ফায়ার সার্ভিসের ডিজি জায়েদ কামালের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে আবেগাপ্লুত ইয়ামি গৌতম এশিয়ান গেমসের ব্যর্থতা নিয়ে বিসিবিতে যাবে নারী দলের রিপোর্ট প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ শতাংশ করল এডিবি তিন আইনে মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা, দাবি এইচআরডব্লিউর শিয়ালের মাংস, তক্ষক ও জোঁকের তেল: রোগ সারানোর দাবির কতটা সত্য? ট্রাম্প-মেলানিয়ার নৈশভোজে তারেক রহমান ও জুবাইদা আজ পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম জাতিসংঘে প্রথম দিনেই ১০ কর্মসূচিতে অংশ নিলেন তারেক রহমান
  • শিয়ালের মাংস, তক্ষক ও জোঁকের তেল: রোগ সারানোর দাবির কতটা সত্য?

    শিয়ালের মাংস, তক্ষক ও জোঁকের তেল: রোগ সারানোর দাবির কতটা সত্য?
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা কমে, তক্ষক খেলে হাঁপানি সারে—বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন নানা লোকবিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। একইভাবে জোঁকের তেল নিয়েও বাত-ব্যথা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা সারানোর দাবি শোনা যায়।

    তবে এসব দাবির পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা? চিকিৎসাবিজ্ঞানে এগুলোর কোনো স্বীকৃত ব্যবহার আছে কি? আবার এসব বিশ্বাসের কারণে বন্যপ্রাণীর ওপরই বা কী ধরনের প্রভাব পড়ছে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

    বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও প্রচলিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, শিয়ালের মাংস, তক্ষক কিংবা বাজারে বিক্রি হওয়া কথিত জোঁকের তেলকে রোগ নিরাময়ের উপায় হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং এমন বিশ্বাসের কারণে বন্যপ্রাণী শিকার, পাচার এবং অবৈধ বাণিজ্যের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

    শিয়ালের মাংসে কি সত্যিই রোগ সারে?

    বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় শিয়ালকে ঘিরে নানা লোকবিশ্বাস রয়েছে। কোথাও শিয়ালকে অশুভ প্রাণী হিসেবে দেখা হয়, আবার কোথাও এর মাংসের কথিত ঔষধি গুণের কথা প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, শিয়ালের মাংস খেলে হাঁপানি, বাতসহ দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন রোগ থেকে উপকার পাওয়া যায়।

    সম্প্রতি বরিশালে সাতটি শিয়াল পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও শিয়ালের মাংস খাওয়ার এমন লোকবিশ্বাসের বিষয়টি সামনে আসে।

    তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলছেন, শিয়ালের মাংসে কোনো ঔষধি গুণ থাকার প্রমাণ নেই। তাঁর মতে, এ ধরনের ধারণা মূলত ভ্রান্ত বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও জানান, শিয়ালের মাংস রোগ সারায়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আধুনিক ফার্মাকোলজিতেও এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায় না।

    অর্থাৎ, কোনো রোগের চিকিৎসা হিসেবে শিয়ালের মাংস খাওয়ার পক্ষে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত প্রমাণ নেই।

    তক্ষক নিয়ে কোটি টাকার গুজব

    বাংলাদেশে তক্ষককে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের গুজব ও প্রতারণার ঘটনা সামনে এসেছে। ক্যানসারসহ দুরারোগ্য ব্যাধি সারানো, যৌনক্ষমতা বাড়ানো কিংবা বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় তক্ষকের দেহের অংশ ব্যবহারের কথিত দাবিও রয়েছে।

    এসব দাবির সঙ্গে যুক্ত করে কখনো কখনো একটি তক্ষকের দাম কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলেও প্রচার করা হয়েছে। কথিত ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

    তবে তক্ষকের এসব কথিত ঔষধি গুণ কিংবা কোটি টাকার বৈধ বাজারমূল্যের পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

    বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, তক্ষককে ঘিরে একসময় প্রতারণার একটি চক্র গড়ে উঠেছিল। এসব গুজবের কারণে মানুষ তক্ষক ধরতে উৎসাহিত হয়েছে এবং পাচারের ঘটনাও ঘটেছে। বর্তমানে আগের তুলনায় তক্ষক ধরার প্রবণতা কিছুটা কমলেও বিষয়টি এখনো উদ্বেগের।

    জোঁকের তেল আর লিচ থেরাপি এক নয়

    জোঁক দিয়ে চিকিৎসার ইতিহাস অবশ্য অনেক পুরোনো। ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাপদ্ধতিতে জীবন্ত জোঁক ব্যবহারের কথা পাওয়া যায়। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থাতেও নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রিতভাবে মেডিকেল লিচ বা জোঁক ব্যবহারের চিকিৎসাপদ্ধতি রয়েছে।

    এই চিকিৎসাপদ্ধতিকে বলা হয় লিচ থেরাপি বা হিরুডোথেরাপি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জীবন্ত মেডিকেল জোঁক ব্যবহারের বিষয়টি বাজারে প্রচলিত ‘জোঁকের তেল’-এর দাবির সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

    হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদের মতে, নির্দিষ্ট প্রজাতির মেডিকেল জোঁক ব্যবহার করে কিছু ক্ষেত্রে লিচ থেরাপি দেওয়া হয়। তবে বাজারে প্রচলিত জোঁকের তেল বাত, ব্যথা কিংবা যৌনসমস্যা সারায়—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও বলেন, জোঁকের তেলের ঔষধি গুণের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

    তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রিত লিচ থেরাপির ব্যবহার থাকলেও, সেটিকে জোঁকের তেল বিক্রির বিভিন্ন দাবির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

    রোগ সারানোর আশায় স্বাস্থ্যঝুঁকি

    অজানা উৎসের বন্যপ্রাণীর মাংস বা দেহজাত উপাদান খাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বন্যপ্রাণীর শরীরে থাকা বিভিন্ন জীবাণু, পরজীবী বা অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় কোনো প্রাণীর মাংস বা দেহজাত উপাদান কার্যকর—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকলে সেটিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

    রোগের উপসর্গ দেখা দিলে লোকজ বা গুজবনির্ভর চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

    আইনেও নিষিদ্ধ শিয়াল ও তক্ষক শিকার

    শিয়াল ও তক্ষক নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার শুধু প্রাণী দুটির জন্যই হুমকি তৈরি করছে না, আইনগত সমস্যাও তৈরি করতে পারে।

    বাংলাদেশের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা), ২০২৬’ আইনে খেঁকশিয়াল, পাতিশিয়াল ও তক্ষককে সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

    আইন অনুযায়ী, গবেষণা বা বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন ছাড়া এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা পজেশন সার্টিফিকেট না থাকলে এসব প্রাণী শিকার, উত্যক্ত, পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা আমদানি-রপ্তানি করা যাবে না।

    বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস বলেন, শিয়াল ও তক্ষককে ঘিরে দেশে নানা কুসংস্কার রয়েছে। তক্ষকের কথিত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যেরও কোনো ভিত্তি নেই।

    আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় বন বিভাগ, পুলিশ, কাস্টমস, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড সংশ্লিষ্ট বন্যপ্রাণী বা আলামত জব্দ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।

    আন্তর্জাতিকভাবে কম ঝুঁকিতে থাকলেও স্থানীয় চাপ গুরুত্বপূর্ণ

    বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি প্রাণী আন্তর্জাতিকভাবে কতটা ঝুঁকিতে আছে, তার পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট দেশে বা অঞ্চলে তার ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

    আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে খেঁকশিয়ালকে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ এবং তক্ষককে ‘লিস্ট কনসার্ন’ বা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

    ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও তক্ষক ‘লিস্ট কনসার্ন’ অবস্থানে রয়েছে। তবে আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলমের মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয় হলো তক্ষককে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।

    এর অর্থ হলো, কোনো প্রাণী আন্তর্জাতিকভাবে বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে না থাকলেও একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত শিকার, সংগ্রহ ও বাণিজ্যের কারণে তার স্থানীয় জনসংখ্যার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

    কুসংস্কারের প্রভাব শুধু প্রাণীর ওপর নয়

    শিয়ালের মাংস, তক্ষক বা জোঁকের তেল নিয়ে প্রচলিত দাবিগুলোকে শুধু কুসংস্কার হিসেবে দেখলে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। এসব বিশ্বাস মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি বন্যপ্রাণী শিকার ও অবৈধ বাণিজ্যকেও উৎসাহিত করতে পারে।

    একটি প্রাণীর কথিত ‘ঔষধি গুণ’ নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়লে সেটির চাহিদা বাড়তে পারে। আর চাহিদা তৈরি হলে শুরু হতে পারে প্রকৃতি থেকে প্রাণী সংগ্রহ, পাচার ও অবৈধ কেনাবেচা।

    তক্ষককে ঘিরে কোটি টাকার গুজব তার একটি উদাহরণ। একইভাবে শিয়ালের মাংস নিয়ে প্রচলিত লোকবিশ্বাসও প্রাণী হত্যার কারণ হতে পারে।

    বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাই নিরাপদ পথ

    লোকজ বিশ্বাস সমাজ ও সংস্কৃতির অংশ হলেও কোনো রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের গুরুত্ব আলাদা। শিয়ালের মাংস রোগ সারায়, তক্ষক দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা করে কিংবা জোঁকের তেল বাত-ব্যথা ও যৌনসমস্যা দূর করে—এ ধরনের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

    অন্যদিকে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতির সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার থাকলে সেটিকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা-প্রোটোকল ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতেই বিবেচনা করতে হয়। লিচ থেরাপির ক্ষেত্রে যেমন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মেডিকেল জোঁক ব্যবহারের নজির রয়েছে, কিন্তু তা বাজারে প্রচলিত জোঁকের তেলের বিভিন্ন দাবিকে বৈধতা দেয় না।

    তাই রোগ সারানোর আশায় বন্যপ্রাণীর মাংস বা দেহজাত কোনো উপাদানের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কুসংস্কার ও গুজবের কারণে বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধ করা এবং এসব প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাস ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন