বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • চলতি বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না প্রতিমন্ত্রী ফায়ার সার্ভিসের ডিজি জায়েদ কামালের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে আবেগাপ্লুত ইয়ামি গৌতম এশিয়ান গেমসের ব্যর্থতা নিয়ে বিসিবিতে যাবে নারী দলের রিপোর্ট প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ শতাংশ করল এডিবি তিন আইনে মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা, দাবি এইচআরডব্লিউর শিয়ালের মাংস, তক্ষক ও জোঁকের তেল: রোগ সারানোর দাবির কতটা সত্য? ট্রাম্প-মেলানিয়ার নৈশভোজে তারেক রহমান ও জুবাইদা আজ পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম জাতিসংঘে প্রথম দিনেই ১০ কর্মসূচিতে অংশ নিলেন তারেক রহমান
  • তিন আইনে মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা, দাবি এইচআরডব্লিউর

    তিন আইনে মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা, দাবি এইচআরডব্লিউর
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    জাতীয় সংসদে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে পাস হওয়া তিনটি আইন বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির অভিযোগ, এসব আইনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া মানবাধিকার সুরক্ষার কিছু সংস্কার বাতিল করা হয়েছে।

    বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থাটি এসব কথা জানায়।

    এইচআরডব্লিউর মতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনি কাঠামোয় বেশ কিছু সংস্কার এনেছিল। নতুন আইনগুলোতে সেই সংস্কারের কিছু অংশ বাদ দেওয়ায় অতীতে ব্যাপকভাবে ঘটে যাওয়া গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর ব্যবস্থা দুর্বল হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

    এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেন, ‘অতীতের সেই ভয়াবহ নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা, যার নির্যাতন ও অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করার পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।’

    নতুন সরকারের উদ্যোগের ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহি ও নজরদারির বাইরে রাখার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

    মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা নিয়ে আপত্তি

    এইচআরডব্লিউর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের পর দীর্ঘদিন এর স্বাধীনতা ও তদন্ত ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা না থাকায় সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে প্রতিবেদন চাওয়া ও সুপারিশ করার মধ্যেই কার্যক্রম সীমিত ছিল।

    অন্তর্বর্তী সরকার এনএইচআরসিকে শক্তিশালী করতে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সদস্য নিয়োগ, অর্থায়ন ও জনবল ব্যবস্থাপনায় কমিশনের স্বাধীনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

    এইচআরডব্লিউর দাবি, ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া নতুন আইনে কমিশনের সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা আবার সীমিত করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে কমিশন।

    তবে আইনের একটি ধারায় সংশ্লিষ্ট সংস্থা জবাব না দিলে বা তাদের দেওয়া প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে এনএইচআরসি নিজে তদন্ত শুরু করতে পারবে বলে উল্লেখ রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

    এ ছাড়া গোপন আটককেন্দ্র থাকার সন্দেহ হলে সেগুলোতে নজরদারি, পরিদর্শন ও তদন্তের যে ক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল, নতুন আইনে তা বাদ দেওয়া হয়েছে বলে এইচআরডব্লিউর দাবি।

    কমিশনের সদস্য নিয়োগে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসা, বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা কমে যাওয়া এবং জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার স্বাধীনতা হ্রাস নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি।

    এইচআরডব্লিউ বলছে, নতুন আইনটি জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘প্যারিস নীতিমালা’র মানদণ্ড পূরণে যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে তদন্তের ক্ষমতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে বলে তাদের মূল্যায়ন।

    গুম প্রতিরোধের আইনেও পরিবর্তন

    ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত নতুন আইন পাস হয়। এই আইনেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা সংস্কারের কিছু অংশ বাতিল করা হয়েছে বলে দাবি করেছে এইচআরডব্লিউ।

    সংস্থাটির মতে, আগের অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা এনএইচআরসিকে দেওয়া হলেও নতুন আইনে তা রাখা হয়নি। এখন কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সরকার অন্য একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে।

    গুমের ঘটনায় কমান্ডের দায় নির্ধারণের আইনি মানদণ্ডেও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির ভাষ্য, আগের কাঠামোয় কোনো কর্মকর্তা কোনো লঙ্ঘন সম্পর্কে জানতেন বা জানা উচিত ছিল এবং তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেননি—এমন পরিস্থিতিতেও দায় নির্ধারণের সুযোগ ছিল। নতুন আইনে কোনো কমান্ডিং কর্মকর্তাকে গুমের জন্য দায়ী করতে সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ প্রয়োজন হবে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

    র‍্যাবের পরিবর্তে এসআরবি

    মানবাধিকার সংগঠনটির আপত্তির তৃতীয় বিষয় হলো র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন নামে বাহিনী পরিচালনার সিদ্ধান্ত।

    এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন অ্যাক্ট’ পাস হয়। এর মাধ্যমে র‍্যাবের পরিবর্তে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন বাহিনী গঠনের আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

    সংস্থাটির দাবি, নতুন বাহিনীতে বিলুপ্ত র‍্যাবের জনবল, ক্ষমতা, নথিপত্র ও অন্যান্য সম্পদ হস্তান্তর করা হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর নতুন বাহিনী কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।

    বাহিনীর নাম পরিবর্তন হলেও কার্যকর সংস্কারের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, নতুন আইনে মানবাধিকার সুরক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাধীন নজরদারি ও জবাবদিহির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

    এর আগে র‍্যাবের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল এবং বাহিনীটির সাবেক কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিচার কার্যক্রম চলার বিষয়টিও বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।

    সংস্থাটি আরও বলেছে, র‍্যাবের নাম পরিবর্তন করলেই অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় বা কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয় না।

    আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান

    বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নতুন আইনগুলোর আওতায় মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও চাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।

    সংস্থাটি বলেছে, এসআরবির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যেসব বিধিমালা এখনো প্রণয়ন করা হয়নি, সেখানে কঠোর মানবাধিকার যাচাই, স্বাধীন নজরদারি, গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে সুরক্ষা এবং র‍্যাবের নথিপত্র ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

    বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়মিতভাবে সামরিক সদস্যদের প্রেষণে মোতায়েন বন্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

    যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন নামে যাত্রা শুরু করা বাহিনীর ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার আহ্বান জানিয়ে এইচআরডব্লিউ বলেছে, মানবাধিকার সুরক্ষা ও অতীতের লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা উচিত।

    ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ বাংলাদেশের অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরও মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা নিয়ে উদ্বেগ জানানো উচিত বলে মনে করে সংস্থাটি।

    ইলেইন পিয়ারসন বলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা ব্যাপক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন। এরপর তারেক রহমান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। নতুন সরকার এত দ্রুত শেখ হাসিনার সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ অনুসরণ করছে দেখে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। কারণ, এই পথ কোথায় নিয়ে যেতে পারে, তা আমরা দেখেছি।’


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন