আজ পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম

ইসলামি আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে যাঁদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের অন্যতম হযরত শেখ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)। মুসলিম বিশ্বের বহু মানুষের কাছে তিনি ‘বড় পীর’ নামে পরিচিত। তাঁর জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা, আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
প্রতি বছর তাঁর ওফাত দিবস স্মরণে পালিত হয় ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’। ‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ এগারো। প্রচলিত ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, আরবি রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর ওফাত হয়েছে বলে তাঁর অনুসারীরা মনে করেন। এ কারণে দিনটি ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’ নামে পরিচিত।
কে ছিলেন আবদুল কাদির জিলানী
হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর জন্ম পারস্যের জিলান অঞ্চলে বলে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে তিনি জ্ঞানার্জনের জন্য বাগদাদে যান। সে সময় বাগদাদ ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্র।
বাগদাদে তিনি কোরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির, আরবি ভাষা ও অন্যান্য ইসলামি জ্ঞান বিষয়ে দীর্ঘ সময় অধ্যয়ন করেন। ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা ও আত্মশুদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেন।
তাঁর বক্তব্য ও শিক্ষায় বারবার ফিরে এসেছে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, সংযম, বিনয়, তওবা, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং মানুষের প্রতি সদাচরণের বিষয়।
জ্ঞানচর্চা থেকে আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব
আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) শুধু একজন সুফিসাধক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন ধর্মীয় শিক্ষক ও বক্তা। তাঁর বক্তব্য শুনতে বাগদাদে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হতেন বলে ঐতিহ্যগত বর্ণনায় পাওয়া যায়।
তিনি মানুষের বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি অন্তরের পরিশুদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দিতেন। তাঁর শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং চরিত্রকে সুন্দর করা।
তাঁর কাছে আধ্যাত্মিকতা কেবল নির্জনে সাধনার বিষয় ছিল না; বরং মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও এর প্রকাশ রয়েছে—এমন শিক্ষাই তাঁর অনুসারীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
কাদেরিয়া তরিকা ও তাঁর প্রভাব
হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর নামের সঙ্গে কাদেরিয়া তরিকার সম্পর্ক গভীরভাবে যুক্ত। পরবর্তী সময়ে তাঁর শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক ধারা অনুসরণ করে কাদেরিয়া তরিকা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে।
দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কাদেরিয়া তরিকার অনুসারী রয়েছে। বাংলাদেশেও এ তরিকার অনুসারীদের মধ্যে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখা যায়।
তবে সুফি ঐতিহ্যের বিভিন্ন ধারা ও তরিকার চর্চায় অঞ্চলভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে। ফলে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালনের ধরনও সব জায়গায় এক নয়।
তাঁর শিক্ষার মূল বার্তা
আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর নামে প্রচলিত বিভিন্ন বক্তব্য ও রচনায় মানুষের আত্মশুদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেখা যায়। তাঁর শিক্ষার সঙ্গে সাধারণভাবে যেসব বিষয়কে যুক্ত করা হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
সত্য ও সততা: মিথ্যা, প্রতারণা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকা।
আত্মসংযম: মানুষের প্রবৃত্তি ও অহংকার নিয়ন্ত্রণ করা।
তওবা: ভুল ও গুনাহ থেকে ফিরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
মানবসেবা: দরিদ্র, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
বিনয়: জ্ঞান, সম্পদ বা মর্যাদা অর্জনের পরও অহংকার থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহর প্রতি আস্থা: কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখা।
এসব মূল্যবোধ শুধু ধর্মীয় জীবনের জন্য নয়, সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনের নৈতিকতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম কীভাবে পালিত হয়
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদ, খানকাহ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নানা আয়োজন করা হয়। কোথাও কোরআন তিলাওয়াত ও মিলাদ মাহফিল হয়, কোথাও হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর জীবন ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
এ ছাড়া দোয়া ও মোনাজাত, দরুদ পাঠ এবং মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণের আয়োজনও দেখা যায়। অনেকে এ দিনকে কেন্দ্র করে নফল ইবাদত করেন এবং দান-সদকা করেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পীর-মাশায়েখ ও আলেমদের উদ্যোগে তাঁর জীবন ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার ওপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব অনুষ্ঠানে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
‘বড় পীর’ নামে পরিচিতি
হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-কে উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন ধরে ‘বড় পীর’ নামে অভিহিত করা হয়। তাঁর প্রতি এই সম্মান মূলত তাঁর ধর্মীয় জ্ঞান, আধ্যাত্মিক সাধনা ও ব্যাপক প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাঁর নামে বহু গ্রন্থ, মাদরাসা, খানকাহ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর জীবন ও শিক্ষা নিয়ে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় বহু বই ও রচনা প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘আল-গুনইয়া লি তালিবি তারিকিল হক’ এবং ‘ফুতুহুল গায়ব’ বিশেষভাবে পরিচিত। তবে তাঁর নামে প্রচলিত সব বক্তব্য বা বর্ণনার ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা এক নয়। তাই তাঁর জীবন ও শিক্ষার বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্য উৎস অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাগদাদে তাঁর স্মৃতিচিহ্ন
হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর জীবন ও স্মৃতির সঙ্গে ইরাকের বাগদাদের নাম গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর মাজার ও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় স্থাপনা বহু বছর ধরে তাঁর অনুসারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁর অনুসারীরা বাগদাদে যান। সেখানে তাঁকে স্মরণ করে দোয়া ও ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে।
শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, শিক্ষার চর্চাও
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ধর্মীয় ব্যক্তিরা সাধারণত কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর জীবন থেকে নৈতিক শিক্ষা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
তাঁর জীবনকে স্মরণ করার অর্থ হতে পারে নিজের চরিত্র ও আচরণ পর্যালোচনা করা—সত্য কথা বলা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা, অহংকার থেকে দূরে থাকা, অন্যায় পরিহার করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
বর্তমান সময়ে যখন ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নানা ধরনের নৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিকতার মতো বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় আসে।
ওফাত ও স্মরণ
ঐতিহাসিক সূত্র ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর ওফাত ৫৬১ হিজরি বা ১১৬৬ খ্রিস্টাব্দে হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক প্রভাব মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম তাই তাঁর অনুসারীদের কাছে শুধু একটি স্মরণদিবস নয়; এটি তাঁর জীবন, জ্ঞান, আত্মশুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের কথা মনে করার একটি উপলক্ষ।
দিনটি ঘিরে আয়োজিত দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত, আলোচনা ও দান-সদকার মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। একই সঙ্গে তাঁর জীবন থেকে সত্য, ন্যায়, বিনয়, সংযম ও মানুষের কল্যাণের শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।