ফ্রিজে মুরগির মাংস কতদিন নিরাপদ থাকে, নষ্ট হওয়ার লক্ষণ কী

একসঙ্গে বেশি পরিমাণ মুরগির মাংস কিনে ফ্রিজে রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করেন অনেকেই। এতে সময় ও ঝামেলা দুটোই কমে। তবে শুধু ফ্রিজে রাখলেই মাংস দীর্ঘদিন নিরাপদ থাকবে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। সংরক্ষণের তাপমাত্রা, পদ্ধতি এবং কতদিন পর মাংস ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে।
বিশেষ করে কাঁচা মুরগির মাংস সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে এতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যেতে পারে। আবার বাইরে থেকে মাংস স্বাভাবিক দেখালেও সেটি খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে থাকতে পারে। তাই মাংস সংরক্ষণের সময় কয়েকটি বিষয় জানা জরুরি।
সাধারণ ফ্রিজে কতদিন রাখা যাবে
মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) নির্দেশনা অনুযায়ী, কাঁচা মুরগির মাংস সাধারণ রেফ্রিজারেটরে এক থেকে দুই দিন রাখা নিরাপদ। তাই বাজার থেকে মাংস আনার পর এক থেকে দুই দিনের মধ্যে রান্না করে নেওয়া ভালো।
অন্যদিকে রান্না করা মুরগির মাংস সাধারণ ফ্রিজে তিন থেকে চার দিন সংরক্ষণ করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে ফ্রিজের তাপমাত্রা চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখা প্রয়োজন।
আর মাংস কয়েক দিনের বেশি রাখতে চাইলে ডিপ ফ্রিজ ব্যবহার করা উচিত। প্রায় মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মাংস দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়।
মাংস ফ্রিজে রাখার সঠিক পদ্ধতি
কাঁচা মুরগির মাংস কিনে এনে খোলা অবস্থায় ফ্রিজের তাকে রেখে দেওয়া ঠিক নয়। মাংস থেকে বের হওয়া তরল অন্য খাবারের ওপর পড়লে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এ কারণে মাংস ভালোভাবে মোড়ানো বা ঢাকনাযুক্ত বায়ুরোধী পাত্রে রাখা ভালো। সম্ভব হলে ফ্রিজের নিচের তাকে রাখুন। এতে মাংসের তরল অন্য খাবারের ওপর পড়ার আশঙ্কা কমে।
ফ্রিজও অতিরিক্ত খাবার দিয়ে ঠেসে রাখা উচিত নয়। ঠান্ডা বাতাস যাতে ভেতরে ঠিকভাবে চলাচল করতে পারে, সেজন্য কিছুটা জায়গা খালি রাখা প্রয়োজন।
মুরগির মাংস নষ্ট হয়েছে বুঝবেন যেভাবে
মাংস নষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি পরিবর্তন চোখে পড়তে পারে। তবে শুধু একটি লক্ষণ দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
রঙের অস্বাভাবিক পরিবর্তন: কাঁচা মুরগির মাংসের রঙ সংরক্ষণের সময় কিছুটা বদলাতে পারে। তাই সামান্য রঙ পরিবর্তন হলেই মাংস নষ্ট হয়েছে ধরে নেওয়া যাবে না। তবে রঙের পরিবর্তনের সঙ্গে অন্য অস্বাভাবিক লক্ষণ থাকলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। নষ্ট মাংস ফিকে বা অস্বাভাবিকভাবে গাঢ় দেখাতে পারে।
চটচটে বা পিচ্ছিল ভাব: তাজা মাংস ভেজা থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণত অতিরিক্ত আঠালো বা পিচ্ছিল হয় না। হাতে নেওয়ার পর অস্বাভাবিকভাবে চটচটে কিংবা পিচ্ছিল মনে হলে সেটি নষ্ট হওয়ার লক্ষণ হতে পারে। এমন মাংস ধুয়ে বা রান্না করে খাওয়ার চেষ্টা না করাই নিরাপদ। ইউএসডিএর নির্দেশনাতেও এ ধরনের মাংস ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অস্বাভাবিক গন্ধ: মাংস থেকে টক, পচা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক গন্ধ বের হলে সেটি খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে দুর্গন্ধের পাশাপাশি রঙ বদলে গেলে বা মাংসে পিচ্ছিল ভাব দেখা দিলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়ে।
ঘরের তাপমাত্রায় কতক্ষণ রাখা নিরাপদ
কাঁচা মুরগির মাংস বাজার থেকে এনে দীর্ঘ সময় ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা ঠিক নয়। দুই ঘণ্টার বেশি বাইরে থাকলে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই বাজার থেকে বাড়িতে ফেরার পর যত দ্রুত সম্ভব মাংস ফ্রিজে রাখা উচিত।
গরমের সময় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাজার থেকে মাংস কিনে গাড়ি বা মোটরসাইকেলে দীর্ঘ সময় রেখে পরে ফ্রিজে তোলার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।
নষ্ট মাংস রান্না করে খাওয়া যাবে?
মাংসে পচা গন্ধ, অতিরিক্ত চটচটে ভাব বা নষ্ট হওয়ার অন্য কোনো লক্ষণ দেখা দিলে সেটি রান্না করে খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।
কারণ রান্না করলেই নষ্ট খাবারের সব ধরনের ঝুঁকি দূর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই মাংসের মান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তা ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
বরফ ছাড়ানোর সময়ও সতর্কতা জরুরি
ডিপ ফ্রিজে রাখা মুরগির মাংস রান্নার আগে সঠিকভাবে বরফমুক্ত করতে হবে। ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় রেখে বরফ ছাড়ানোর পরিবর্তে সাধারণ ফ্রিজের অংশে রেখে ধীরে ধীরে বরফ গলানো নিরাপদ পদ্ধতিগুলোর একটি।
বরফ গলে যাওয়ার পর মাংস আবার দীর্ঘ সময় বাইরে রেখে না দিয়ে দ্রুত রান্না করা উচিত।
সব মিলিয়ে, কাঁচা মুরগির মাংস সাধারণ ফ্রিজে এক থেকে দুই দিনের মধ্যে রান্না করে নেওয়াই ভালো। বেশি সময় রাখতে হলে ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করা উচিত। পাশাপাশি মাংসের গন্ধ, রঙ ও গঠন খেয়াল করতে হবে।
তবে শুধু রঙ পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে মাংস নষ্ট হয়েছে কি না সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। অস্বাভাবিক গন্ধ, চটচটে বা পিচ্ছিল ভাব এবং রঙের পরিবর্তন একসঙ্গে দেখা দিলে মাংস ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করলে খাবারের অপচয় কমানোর পাশাপাশি খাদ্যবাহিত অসুস্থতার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।