৭৫ কোটি বই বিক্রি করেও আজ বিস্মৃত বারবারা কার্টল্যান্ড

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বই বিক্রি করা লেখকদের তালিকায় উইলিয়াম শেক্সপিয়র ও আগাথা ক্রিস্টির পরেই যার নাম উচ্চারিত হয়, সেই বারবারা কার্টল্যান্ডকে আজকের বইয়ের দোকানে খুঁজে পাওয়া কঠিন। জীবদ্দশায় প্রায় ৭৫ কোটি বই বিক্রি করা এই ব্রিটিশ লেখিকা একসময় রোমান্টিক কথাসাহিত্যের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি ছিলেন। অথচ মৃত্যুর আড়াই দশক পর তার সাহিত্যকর্মের চেয়ে বিচিত্র ব্যক্তিত্ব ও নিজস্ব জীবনযাপনই যেন মানুষের মনে বেশি জায়গা করে নিয়েছে।
কার্টল্যান্ডের পরিচিতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গোলাপি রঙের প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা, অস্বাভাবিক সাজসজ্জা, সবসময় সঙ্গে রাখা ছোট কুকুর এবং স্বাস্থ্য নিয়ে নানা ধরনের অদ্ভুত অভ্যাস। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ভিটামিন বড়ি খাওয়ার অভ্যাসের কথাও আলোচিত ছিল। তিনি ছিলেন প্রিন্সেস ডায়ানার সৎ-দাদি এবং ডায়ানা নিজেও তার বইয়ের পাঠক ছিলেন।
১৯০১ সালে জন্ম নেওয়া বারবারা কার্টল্যান্ড প্রায় পুরো বিশ শতকজুড়ে বেঁচেছিলেন। দুটি বিশ্বযুদ্ধ, সামাজিক ও যৌন বিপ্লব, নারীমুক্তি আন্দোলন, যুক্তরাজ্যে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর উত্থান থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের আবির্ভাব—তার জীবনের সময়সীমার মধ্যে ঘটে গেছে শতাব্দীর অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগেও নিজের ওয়েবসাইট চালু করেছিলেন তিনি।
শৈশবেই তার জীবনে বড় ধাক্কা আসে। মাত্র দুই বছর বয়সে পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। তার পিতামহ দেউলিয়া হওয়ার পর আত্মহত্যা করেন। এর পর পরিবারের আর্থিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। বড় বাড়ি ছেড়ে তার বাবা-মাকে তুলনামূলক সীমিত জীবনযাপন করতে হয়। তার বাবা পরে মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়লেও মা পলি সামাজিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান।
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও বারবারা অল্প বয়সেই ব্রিটিশ অভিজাত সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হন। সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করা কার্টল্যান্ড ১৯২৫ সালে প্রকাশ করেন তার প্রথম উপন্যাস ‘জিগস’। ফরাসি কনভেন্ট স্কুলের এক তরুণীর প্রেমের সন্ধানে লন্ডনে আসার গল্প ছিল বইটির মূল বিষয়।
পরবর্তী সময়ে তার লেখালেখি নানা বিতর্কও তৈরি করে। ১৯২৬ সালের একটি নাটক অতিরিক্ত যৌন আবেদনময়তার অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়। ১৯৩৫ সালের ‘ফার্স্ট ক্লাস লেডি’ উপন্যাসে অবৈধ গর্ভপাতের প্রসঙ্গ থাকায় আয়ারল্যান্ডে বইটি সেন্সরের মুখে পড়ে। আবার ১৯৩৬ সালের ‘ডেঞ্জারাস এক্সপেরিমেন্ট’ উপন্যাসে নাৎসি জার্মানির ইহুদিবিদ্বেষের বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
তবে কার্টল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সাফল্যের সময় আসে ১৯৬০, ৭০ ও ৮০-এর দশকে। সে সময় সস্তা পেপারব্যাক বইয়ের বাজার দ্রুত বাড়ছিল। প্রকাশকেরা তার নতুন লেখার অপেক্ষায় থাকতেন। তিনিও অবিশ্বাস্য গতিতে লিখতেন—প্রায় প্রতি দুই সপ্তাহে একটি বই শেষ করার নজির ছিল তার।
জীবদ্দশায় তিনি ৭২৩টি বই লিখেছেন। এসবের বড় অংশই ছিল ঐতিহাসিক রোমান্সধর্মী উপন্যাস। তার গল্পে সাধারণত নিষ্পাপ ও তরুণ নারীদের সঙ্গে ধনী ও ক্ষমতাবান ডিউক, লর্ড কিংবা ক্যাপ্টেনের প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে কাহিনি এগিয়ে যেত।
তার প্রধান পাঠক ছিলেন কর্মজীবী ও গৃহিণী নারীরা। বাস্তব জীবনের কঠিন পরিস্থিতি থেকে কিছু সময়ের জন্য পাঠকদের দূরে নিয়ে গিয়ে তিনি তাদের সামনে তুলে ধরতেন বিলাসিতা, সুন্দর পোশাক, রোমান্স ও আকর্ষণীয় পুরুষের এক কল্পনার জগৎ।
কার্টল্যান্ডের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় দিক ছিল তার নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করার অসাধারণ দক্ষতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগের অনেক আগেই তিনি নিজের পোশাক, সাজসজ্জা, আচরণ ও জনসম্মুখের উপস্থিতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন, যা তাকে অন্য লেখকদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।
এমনকি প্রচারণামূলক সফরে নিজের পোষা কুকুর সঙ্গে নিতে না পারলেও তার তৈরি করা ইমেজে যেন কোনো ছেদ না পড়ে, সে জন্য পুতুল কুকুর বগলে নিয়ে অনুষ্ঠানে হাজির হওয়ার ঘটনাও আলোচিত হয়েছে।
প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গেও তার পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। কার্টল্যান্ডের মেয়ে রাইনের সঙ্গে ১৯৭৬ সালে ডায়ানার বাবা আর্ল স্পেন্সারের বিয়ে হলে বারবারা কার্টল্যান্ড ডায়ানার সৎ-দাদিতে পরিণত হন। এর আগে থেকেই ডায়ানা তার বইয়ের পাঠক ছিলেন।
তবে তার জনপ্রিয়তার সময়ই নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে তার মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদের সময় কার্টল্যান্ডের রোমান্টিক উপন্যাসের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়তে থাকে। নারীবাদী লেখক জার্মেইন গ্রিয়ারও তার সাহিত্যকর্মের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
১৯৬০ সালে কার্টল্যান্ড ‘রোমান্টিক নভেলিস্টস অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটি এখনও সক্রিয়। বর্তমান সময়ে রোমান্সধর্মী সাহিত্য আবারও তরুণ পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও কার্টল্যান্ডের বই এখন আর আগের মতো সহজে বইয়ের দোকানে চোখে পড়ে না।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে সমালোচকেরা মনে করেন, তার লেখার বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনা ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের পাঠকচাহিদার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সময় বদলেছে, পাঠকের রুচিও বদলেছে। ফলে একসময় কোটি কোটি কপি বিক্রি হওয়া তার বই আজকের বাজারে আগের মতো জায়গা ধরে রাখতে পারেনি।
তবুও বারবারা কার্টল্যান্ডকে বিস্মৃত করা সহজ নয়। বিপুল বই বিক্রির রেকর্ডের পাশাপাশি রোমান্টিক কথাসাহিত্যের বাণিজ্যিক সাফল্য ও লেখক হিসেবে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরির ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন অনন্য নজির।
আজ তার বই হয়তো বইয়ের দোকানের তাকজুড়ে নেই। কিন্তু কোটি কোটি পাঠকের হাতে পৌঁছে যাওয়া সেই বিপুল সাহিত্যভাণ্ডার এবং নিজের ইমেজকে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডে পরিণত করার অসাধারণ দক্ষতার কারণে বারবারা কার্টল্যান্ড বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী নাম হয়েই থাকবেন।
সূত্র: এনডিটিভি