ব্যথা ছাড়াই হতে পারে স্তন ক্যান্সার, যে ৫ লক্ষণ অবহেলা করবেন না

স্তন বা বগলের নিচে নতুন পিণ্ড, স্তনবৃন্তের আকৃতিতে পরিবর্তন, অস্বাভাবিক নিঃসরণ কিংবা ত্বকে গর্তের মতো দাগ—এসব স্তন ক্যান্সারের সম্ভাব্য সতর্কসংকেত হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, স্তন ক্যান্সার সব সময় ব্যথা বা স্পষ্ট পিণ্ডের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। তাই স্তনের স্বাভাবিক গঠন, ত্বক ও স্তনবৃন্তে নতুন কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। আবার কখনো স্তনের আকার, ত্বকের গঠন কিংবা স্তনবৃন্তে সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মাধ্যমেও রোগটি প্রকাশ পেতে পারে। এসব পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত স্ক্রিনিং রোগ শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্তন ক্যান্সারের সম্ভাব্য সতর্কসংকেত
১. নতুন পিণ্ড, যা ব্যথাহীন হতে পারে
স্তন বা বগলের নিচে নতুন কোনো পিণ্ড বা চাকা অনুভূত হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। পিণ্ডটি আশপাশের টিস্যু থেকে আলাদা মনে হতে পারে, আবার এতে কোনো ব্যথাও নাও থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সব সময় নির্দিষ্ট পিণ্ড দেখা যায় না। কখনো স্তনের ত্বক মোটা হয়ে যাওয়া বা শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। তবে স্তনে পিণ্ড হলেই ক্যান্সার হয়েছে, এমন নয়। নতুন কোনো পিণ্ড দেখা দিলে চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
২. স্তনের ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
স্তনের ত্বকে গর্তের মতো দাগ বা ডিম্পলিং, কুঁচকে যাওয়া, লালচে ভাব, আঁশ ওঠা কিংবা ত্বক মোটা হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিলে সতর্ক হওয়া দরকার। কখনো ত্বক কমলার খোসার মতো অমসৃণও দেখাতে পারে।
বিশেষ করে এসব পরিবর্তন নতুন হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা স্পষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। স্তনের স্বাভাবিক আকার বা আকৃতিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলেও বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
তবে এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলেই যে স্তন ক্যান্সার হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা বা অন্য কারণেও এমন পরিবর্তন হতে পারে। পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
৩. স্তনবৃন্তের আকৃতি বা অবস্থান বদলে যাওয়া
স্তনবৃন্ত হঠাৎ ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া, এর অবস্থান পরিবর্তিত হওয়া কিংবা আশপাশের ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে আগে এমন না থাকলে এবং হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
৪. স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ
স্তন থেকে বুকের দুধ ছাড়া অন্য কোনো তরল, বিশেষ করে রক্তমিশ্রিত বা স্বচ্ছ তরল বের হলে তা পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যার সবই ক্যান্সার নয়। তবে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অনেক নারী ব্যস্ততা, সংকোচ কিংবা সমস্যাটি নিজে থেকেই সেরে যাবে—এমন ধারণা থেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। কিন্তু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে লজ্জা বা ব্যস্ততার কারণে পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
৫. ব্যথার জন্য অপেক্ষা করা
স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, রোগটি গুরুতর হওয়ার আগে অবশ্যই ব্যথা হবে। বাস্তবে স্তন ক্যান্সার, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে, ব্যথা ছাড়াই হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্তন ক্যান্সারবিষয়ক তথ্যেও স্তনে অস্বাভাবিক পিণ্ড বা চাকা অনুভূত হলে ব্যথা না থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
স্তনে দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক ব্যথা হলেও পরীক্ষা করানো উচিত। যদিও স্তনে ব্যথার পেছনে হরমোনের পরিবর্তন, সংক্রমণসহ ক্যান্সারবহির্ভূত বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
স্তনের স্বাভাবিক গঠন সম্পর্কে সচেতন থাকুন
নিজের স্তনের স্বাভাবিক গঠন ও অনুভূতি সম্পর্কে ধারণা রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এতে নতুন কোনো পরিবর্তন সহজে শনাক্ত করা যায়। পরিবারের কারও স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসককে সে বিষয়ে জানানো উচিত। বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজন আছে কি না, সে বিষয়েও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
মনে রাখতে হবে, স্তনে কোনো পরিবর্তন দেখা দিলেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। স্তনের বেশির ভাগ পরিবর্তনই ক্যান্সার নয়। তবে নতুন বা অস্বাভাবিক পিণ্ড, ত্বকের পরিবর্তন, স্তনবৃন্তের আকৃতির পরিবর্তন কিংবা অস্বাভাবিক নিঃসরণ দেখা দিলে নিজে থেকে সেরে যাওয়ার অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে নিয়মিত স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কিছু প্রাথমিক স্তন ক্যান্সারে কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না। সচেতনতা, সময়মতো পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে পারে।