সুখ-দুঃখ ও প্রাচুর্য-অভাব নিয়ে সুরা ফাজরের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, প্রাচুর্য-অভাব এবং ক্ষমতা-প্রতিপত্তির পালাবদল ঘটে। কখনো সাফল্য মানুষকে আত্মতৃপ্ত করে, আবার সংকট তাকে হতাশ করে তোলে। অনেকেই সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদাকে সম্মানের মাপকাঠি মনে করেন। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, দুনিয়ায় প্রাচুর্য পাওয়া মানেই আল্লাহর কাছে সম্মানিত হওয়া নয়, আর অভাবগ্রস্ত হওয়াও অপমানিত হওয়ার প্রমাণ নয়। পবিত্র কোরআনের সুরা ফাজরে মানুষের এই ভুল ধারণা এবং জীবন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রাচুর্য ও অভাব—দুটিই পরীক্ষা
সুরা ফাজরের ১৫ ও ১৬ নম্বর আয়াতে মানুষের একটি স্বভাব তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ যখন তার রবের পক্ষ থেকে সম্মান ও প্রাচুর্য লাভ করে, তখন বলে, ‘আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন।’ আর যখন তার জীবিকা সংকুচিত করা হয়, তখন বলে, ‘আমার রব আমাকে অপমানিত করেছেন।’ পরের আয়াতে আল্লাহ এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এই আয়াতগুলো থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, সম্পদ বা অভাব দিয়ে আল্লাহর কাছে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করা যায় না। বরং প্রাচুর্য ও সংকট—উভয়ই মানুষের জন্য পরীক্ষা। সম্পদ পেলে কৃতজ্ঞ থাকা, সৎপথে তা ব্যয় করা এবং অভাবের সময় ধৈর্য ধারণ করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
এতিম ও দরিদ্রের প্রতি দায়িত্ব
সুরা ফাজরের ১৭ থেকে ২০ নম্বর আয়াতে এতিমের প্রতি অবহেলা, দরিদ্রকে খাবার দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ না দেওয়া, উত্তরাধিকার ও সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসার মতো বিষয়গুলোর সমালোচনা করা হয়েছে।
এ আয়াতগুলো মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, শুধু ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও জরুরি। এতিমের অধিকার রক্ষা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সম্পদ অর্জন ও ব্যবহারে ন্যায়নীতি অনুসরণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
অন্যের অধিকার উপেক্ষা করে সম্পদ বাড়ানো কিংবা অসহায় মানুষের দুর্দশার প্রতি উদাসীন থাকা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার পরিপন্থী। তাই ব্যক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি সমাজের দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতিও দায়িত্ব পালন করতে হবে।
ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি চিরস্থায়ী নয়
সুরা ফাজরের শুরুতে আদ, সামুদ ও ফেরাউনের মতো শক্তিশালী জাতি ও শাসকদের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি তাদের রক্ষা করতে পারেনি। অন্যায়, সীমালঙ্ঘন ও জুলুমের পরিণতি সম্পর্কে এসব ঘটনা মানুষকে সতর্ক করে।
এ থেকে বোঝা যায়, ক্ষমতা, পদমর্যাদা কিংবা সম্পদ কখনো অহংকারের কারণ হওয়া উচিত নয়। বরং এসব অর্জনের সঙ্গে দায়িত্ববোধ, ন্যায়পরায়ণতা ও জবাবদিহির বিষয়টিও জড়িত। নিজের অবস্থান বা প্রভাব ব্যবহার করে অন্যের অধিকার নষ্ট করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
প্রশান্ত আত্মার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ
সুরা ফাজরের শেষ আয়াতগুলোতে প্রশান্ত আত্মাকে তার রবের কাছে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত বান্দাদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ রয়েছে।
এখানে প্রশান্ত আত্মা বলতে এমন আত্মাকে বোঝানো হয়েছে, যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্যে স্থির এবং তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট। দুনিয়ার সুখ-দুঃখের পরিবর্তন তাকে ন্যায় ও সৎকর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করে না।
সুরা ফাজরের মূল শিক্ষা হলো, দুনিয়ার সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা নয়; বরং ঈমান, সৎকর্ম, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যই প্রকৃত সাফল্যের পথ। তাই প্রাচুর্যে অহংকারী না হয়ে কৃতজ্ঞ থাকা এবং সংকটে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করাই একজন মুমিনের করণীয়।