নারীর কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবায় এগিয়ে বাংলাদেশ, ক্ষুধা বাড়ছে পাকিস্তানে

ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ায় ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে, পাকিস্তানে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণকে বাংলাদেশের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিপরীতে, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, শিশু অপুষ্টি, নারীদের সীমিত কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ পাকিস্তানের ক্ষুধা সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক (গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স—জিএইচআই) প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালের পর থেকে ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল ক্ষুধা মোকাবিলায় ধারাবাহিক উন্নতি করলেও পাকিস্তানের অগ্রগতি থমকে গেছে। দেশটিতে পরিস্থিতি আবার অবনতির দিকে যাচ্ছে।
জার্মানির বনভিত্তিক ক্ষুধা মোকাবিলায় কাজ করা সংস্থা ওয়েলথাঙ্গারহিলফে, সুইজারল্যান্ডের জুরিখভিত্তিক সহায়তা সংস্থা হেলভেটাস এবং জার্মানির রুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন ইনস্টিটিউট যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ক্ষুধা সূচকের স্কোর ১৯ দশমিক ২। এই স্কোর দেশটিকে মাঝারি বা ‘মডারেট’ পর্যায়ে রেখেছে। ভারতের স্কোর ২৪ দশমিক ১, যা গুরুতর বা ‘সিরিয়াস’ পর্যায়ের ক্ষুধা পরিস্থিতি নির্দেশ করে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও নেপাল।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের ক্ষুধা সূচকের স্কোর ২৫ দশমিক ৫, যা ২০১৮ সালের ২৪ দশমিক ০ স্কোরের তুলনায় অবনতির ইঙ্গিত দেয়। সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১২২টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১০৬তম। দেশটির চেয়ে বেশি স্কোর রয়েছে প্রায় এক ডজন দেশের। এসব দেশের মধ্যে আফগানিস্তান, সিয়েরা লিওন ও সিরিয়াও রয়েছে।
বাংলাদেশের অগ্রগতিতে নারীর কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবার ভূমিকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের অগ্রগতির পেছনে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
লন্ডনভিত্তিক আর্থিক বিশ্লেষক জাভেদ হাসান জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে নারীদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছেন। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোও ক্ষুধা মোকাবিলায় অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক স্বাধীন অর্থনীতিবিদ নিয়াজ মুর্তাজাও মনে করেন, নারীদের কর্মসংস্থানের ধারাবাহিক উন্নতি বাংলাদেশের ক্ষুধা মোকাবিলায় অগ্রগতিকে সহায়তা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের পরিস্থিতিও পাকিস্তানের তুলনায় খুব বেশি আলাদা নয়। ভারতের ক্ষুধা সূচকের স্কোর পাকিস্তানের কাছাকাছি হলেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
চারটি সূচকে নির্ধারিত হয় ক্ষুধার মাত্রা
বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক চারটি প্রধান সূচকের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। এগুলো হলো—অপুষ্টি বা পর্যাপ্ত খাদ্য না পাওয়া, শিশুমৃত্যু, বয়সের তুলনায় শিশুদের উচ্চতা কম হওয়া এবং উচ্চতার তুলনায় শিশুদের ওজন কম হওয়া।
সূচকের মোট গুরুত্বের ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ করে নির্ধারিত হয়েছে অপুষ্টি ও শিশুমৃত্যুর জন্য। বাকি ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ করে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শিশুদের বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম হওয়া এবং উচ্চতার তুলনায় ওজন কম হওয়ার সূচককে।
জিএইচআই স্কোর নির্ধারণ করা হয় শূন্য থেকে ১০০-এর মধ্যে। স্কোর ১০-এর নিচে হলে ক্ষুধার মাত্রা কম, ১০ থেকে ১৯ দশমিক ৯ হলে মাঝারি, ২০ থেকে ৩৪ দশমিক ৯ হলে গুরুতর, ৩৫ থেকে ৪৯ দশমিক ৯ হলে আশঙ্কাজনক এবং ৫০ বা তার বেশি হলে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সে হিসাবে পাকিস্তানের ২৫ দশমিক ৫ স্কোর দেশটিতে গুরুতর ক্ষুধা পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। ২০১৮ সালের ২৪ দশমিক ০ স্কোর থেকে অবনতি দেশটির খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।