হোম ডেলিভারিতে মাদক, ঝুঁকিতে তরুণ প্রজন্ম

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকের বিস্তার, কিশোর-তরুণদের আসক্তি এবং মাদককে কেন্দ্র করে অপরাধের খবর নিয়মিত সামনে আসছে। কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মাদকে জড়িয়ে পড়ছে, কোথাও মুঠোফোনে যোগাযোগ করে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার ও বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না—এমন চিত্র উদ্বেগজনক। মাদক এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবার, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে জড়িত জাতীয় সংকট।
মাদকের সহজলভ্যতা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। আগে মাদক সংগ্রহে নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়ার প্রয়োজন হলেও এখন বিভিন্ন এলাকায় পরিচিতজনের মাধ্যমে ফোন বা মুঠোবার্তায় যোগাযোগ করে সরবরাহ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও বাসায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠছে। প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার অপব্যবহার করে মাদক কারবারিরা সরবরাহের ধরন বদলাচ্ছে। ফলে শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে অভিযান চালিয়ে এই নেটওয়ার্ক নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কিশোর ও তরুণেরা। কৈশোরে কৌতূহল, বন্ধুদের চাপ, সম্পর্কজনিত হতাশা, পারিবারিক দূরত্ব কিংবা মানসিক সংকট থেকে কেউ কেউ মাদকের দিকে ঝুঁকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শুরুতে বিনা মূল্যে বা সামান্য খরচে মাদক দিয়ে আসক্ত করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে নিয়মিত সেবনের অভ্যাস তৈরি হলে নেশার খরচ জোগাতে গিয়ে পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে অর্থের সংকট থেকে চুরি, প্রতারণা কিংবা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
তবে মাদকাসক্ত কিশোর-তরুণদের সবাইকে অপরাধী হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আসক্তি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক সমস্যা। মাদক সরবরাহকারী ও কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা যেমন জরুরি, তেমনি আসক্তদের চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শাস্তি ও প্রতিরোধের পাশাপাশি মানবিক সহায়তার ব্যবস্থা না থাকলে আসক্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো কঠিন হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কতটি অভিযান পরিচালিত হলো, কতজন গ্রেপ্তার হলেন কিংবা কত পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হলো—শুধু এসব পরিসংখ্যান দিয়ে সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়। মাদক সরবরাহের উৎস, পরিবহনপথ, অর্থায়ন, মজুত ও বিতরণব্যবস্থা কতটা দুর্বল করা গেল, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের অন্যতম মানদণ্ড। ছোট বিক্রেতাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মাদক কারবারের পেছনে থাকা অর্থের উৎস ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা আর্থিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে পার পেয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং যৌথ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ করার পাশাপাশি দেশের ভেতরে পরিবহন, মজুত ও খুচরা বিক্রির নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও অপরিহার্য।
মাদক প্রতিরোধের প্রথম ক্ষেত্র পরিবার। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। তবে নজরদারির নামে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা অপমান নয়; সন্তানদের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা বেশি কার্যকর। মানসিক চাপ, হতাশা কিংবা সমস্যার কথা যেন তারা নির্ভয়ে পরিবারের সদস্যদের জানাতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে তিরস্কার বা আড়াল করার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ও কাউন্সেলরের সহায়তা নিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, মাদক সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক সচেতনতা তৈরি, কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। শুধু বক্তৃতা বা প্রচারপত্রের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিক্ষার্থীরা কোথায় সমস্যায় পড়ছে, কী কারণে ঝুঁকিতে যাচ্ছে এবং কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায়—তা বোঝার জন্য শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মাদক কারবারিদের সামাজিকভাবে প্রশ্রয় না দেওয়া, সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দায়িত্বশীলভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং আসক্ত ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য না করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযান ও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সহজলভ্য করা। সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের মান নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং পুনর্বাসনের পর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে পরিবার ও সমাজের সমর্থন না পেলে অনেকে আবার আসক্তির দিকে ফিরে যেতে পারেন। তাই পুনর্বাসনকে বিচ্ছিন্ন কোনো কার্যক্রম হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক সংস্থার পক্ষে সফল করা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, সীমান্তে নজরদারি, কারবারিদের বিচার, পরিবারের সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা এবং আসক্তদের চিকিৎসা—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। নিয়মিত তথ্য প্রকাশ ও ফলাফল মূল্যায়নের মাধ্যমে কোথায় অগ্রগতি হচ্ছে, কোথায় ব্যর্থতা রয়েছে, তা শনাক্ত করতে হবে।
একটি প্রজন্মকে মাদকের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান কিংবা সাময়িক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে মাদকের সরবরাহ ও চাহিদা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক উদ্যোগ নিতে হবে। মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি তরুণদের জন্য শিক্ষা, খেলাধুলা, মানসিক সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য আরও বাড়বে।