মেক্সিকো কি পারবে নিরাপদ বিশ্বকাপ আয়োজন?

২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র চার মাস বাকি। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসরকে ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। তবে আয়োজক দেশগুলোর একটি মেক্সিকোয় নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা কার্টেল সহিংসতা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনা বাড়ছে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে—মেক্সিকো কি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারবে?
বিশ্বকাপ উপলক্ষে লাখো পর্যটক, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা মেক্সিকো সফর করবেন। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে নিরাপত্তা জোরদার এবং ভেন্যু-কেন্দ্রিক বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনের আগে এমন নিরাপত্তা উদ্বেগ স্বাভাবিক হলেও বাস্তব প্রস্তুতি ও সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা—উদ্বেগ কাটিয়ে সফল ও নিরাপদভাবে আয়োজন সম্পন্ন করবে আয়োজক দেশগুলো।
মেক্সিকোর কুখ্যাত কার্টেল নেতা নেমেসিও রুবেন ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস, যিনি ‘এল মেনচো’ নামে পরিচিত। বিশেষ বাহিনীর অভিযানে তিনি নিহত হয়েছেন। তিনি ছিলেন জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল বা সিজেএনজির প্রধান। তার মৃত্যুর পরপরই দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংস প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বন্দুকধারীরা একাধিক অঙ্গরাজ্যে যানবাহনে আগুন দেয় ও মহাসড়ক অবরোধ করে। এতে দেশের বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি বিশ্বকাপে আসতে চাওয়া বিদেশি দর্শকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বকাপের স্বাগতিক শহরগুলোর একটি গুয়াদালাহারা এই সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জালিস্কো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পাবলো লেমুস বাসিন্দাদের ঘরে থাকার আহ্বান জানান ও গণপরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানবন্দরে যাত্রীরা আতঙ্কে দৌড়াচ্ছেন। উপকূলীয় পর্যটন শহর পুয়ের্তো ভাল্লার্তাতেও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
এয়ার কানাডা, ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স এবং আমেরিকান এয়ারলাইন্স ওই অঞ্চলে ফ্লাইট স্থগিত করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এ বছর ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ-২০২৬ যৌথভাবে আয়োজন করবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। এবারের আসর হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। মেক্সিকোর ভেন্যুগুলোতে লাখো বিদেশি দর্শক আসার কথা রয়েছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা সহায়তা দিয়েছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এ তথ্য নিশ্চিত করেন এবং মেক্সিকোর বাহিনীকে অভিনন্দন জানান।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করে জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অধিকাংশ অঞ্চলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
তবে সমালোচকদের মতে, পুড়ে যাওয়া যানবাহন, বাতিল স্কুল কার্যক্রম এবং সামাজিক মাধ্যমে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ বলে বর্ণনা; এসব দৃশ্য আন্তর্জাতিকভাবে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, সিজেএনজি দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত একটি কার্টেল। তাদের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর লড়াই বাড়তে পারে, যা সহিংসতা দীর্ঘায়িত করতে পারে।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, মেক্সিকো কি বিশ্বকাপে আসা প্রায় ১০ লাখ বিদেশি দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে?
এ বিষয়ে ফিফা এখনো সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বিভিন্ন দেশ তাদের ভ্রমণ সতর্কতা পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর ইতোমধ্যে মেক্সিকোয় থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের ঘরে থাকার এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশ্বকাপের আগে মেক্সিকোকে এখন প্রমাণ করতে হবে, তারা নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম। তবে সাম্প্রতিক সহিংসতা সেই চ্যালেঞ্জকে আরও কঠিন করে তুলেছে।