আমন্ত্রণ পেয়েও ভারত-পাকিস্তান বিশ্বকাপ ম্যাচে অনুপস্থিত থাকবেন বুলবুল

বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচ ভারত-পাকিস্তান মহারণ ঘিরে যখন কূটনৈতিক তৎপরতা, ক্রিকেট রাজনীতি ও আঞ্চলিক সমীকরণ তুঙ্গে, ঠিক তখনই আমন্ত্রণ পেয়েও সেখানে উপস্থিত না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল।
ক্রিকেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ক্রিকবাজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ব্যক্তিগত ও নীতিগত অবস্থান থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিবির পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, তবু বিষয়টি ক্রিকেট অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ সবসময়ই বিশ্ব ক্রিকেটে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক বার্তাও প্রায়শই এই ম্যাচকে ঘিরে আলোচনায় আসে। এমন প্রেক্ষাপটে বিসিবি সভাপতির অনুপস্থিতি নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও ক্রিকেট প্রশাসনের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তিনি হয়তো সচেতনভাবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে বিসিবির ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও ক্রীড়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সভা শেষে কুয়েত থেকে সরাসরি শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় যাওয়ার কথা ছিল বুলবুলের। ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি বিশ্বকাপের সূচির অন্যতম আকর্ষণ। আইসিসির পক্ষ থেকে তাকে বিশেষ আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, কলম্বোয় উপস্থিত থেকে তিনি শুধু ম্যাচই দেখবেন না, বরং আঞ্চলিক ক্রিকেট কূটনীতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ এবং আসন্ন দ্বিপক্ষীয় সিরিজ নিয়ে অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করবেন।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলান বিসিবি সভাপতি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না থাকায় কেবল একটি ম্যাচ দেখার উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়াকে তিনি যৌক্তিক মনে করেননি। বিসিবির আম্পায়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান ইফতেখার রহমান মিঠু ক্রিকবাজকে বলেন, আমিনুল ইসলামের সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন ‘বাংলাদেশ যেহেতু নেই, আমি কেন শুধু একটি ম্যাচ দেখার জন্য সেখানে যাব?’ শুরুতে যাওয়ার আগ্রহ থাকলেও পরে বাস্তবতা বিবেচনায় তিনি সফর বাতিল করেন।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশ না নেয়ায় তৈরি হয় নতুন সমীকরণ। বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে ভারত ম্যাচ বর্জনের ঘোষণা দেয় পাকিস্তান সরকার। এতে টুর্নামেন্টের সূচি ও আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ শুরু করে।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান মহসিন নাকভিকে রাজি করাতে কয়েক দিন আগে লাহোর সফরও করেন বুলবুল। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে ম্যাচ খেলতে রাজি করানো সম্ভব হয়।
এই প্রেক্ষাপটে কলম্বোয় তার উপস্থিতি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করত। অনেকেই মনে করছিলেন, এটি হতে পারে দক্ষিণ এশীয় ক্রিকেট কূটনীতিতে নতুন বার্তা দেওয়ার সুযোগ। বিশেষ করে আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফর নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলতে পারত। তবে বিসিবি সভাপতির সিদ্ধান্তে বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে অনুপস্থিত থাকায় তিনি আনুষ্ঠানিক উপস্থিতির চেয়ে নীতিগত অবস্থানকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিশ্বকাপে অংশ না নেয়ার কারণে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে এমন আশঙ্কাও ছিল। সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা বা আর্থিক জরিমানার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে ক্রিকেটাঙ্গনে। তবে আইসিসি স্পষ্ট করেছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে না এবং আর্থিক জরিমানাও আরোপ করা হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, ২০২৮ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ দেয়ার বিষয়েও ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
সব মিলিয়ে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা যতটা মাঠের লড়াইকে কেন্দ্র করে, ততটাই তা কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সমীকরণে ঘনীভূত। সেই প্রেক্ষাপটে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের কলম্বো সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের অনুপস্থিতিতে এশিয়ার দুই পরাশক্তির মহারণ যতই আকর্ষণীয় হোক, বিসিবি সভাপতির মতে-জাতীয় স্বার্থ ও উপস্থিতিই এখানে মুখ্য বিবেচ্য বিষয়।