বিদেশে পড়াশোনা ও কাজের পথে বাংলাদেশিদের বাধা বাড়ছে

বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা, কাজ কিংবা ভালো জীবনের আশায় প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশি ভিসার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে জটিল হয়ে উঠেছে। একের পর এক দেশ বাংলাদেশিদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করছে, কোথাও আবার পুরোপুরি ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। এর ফলে শুধু সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই বাড়ছে না, বরং বাংলাদেশি পাসপোর্টও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরমভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। সরকার গঠনের সময় সংস্কার, মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তার নেতৃত্বে গণতন্ত্রের পথে ফেরার অঙ্গীকার বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। তবে এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা সমস্যার কারণে দেশ ছাড়তে মানুষের প্রবণতা বেড়েছে, যা বাংলাদেশি পাসপোর্টের ওপর আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশি পাসপোর্ট বর্তমানে বিশ্বের সপ্তম দুর্বলতম পাসপোর্ট, পাসপোর্ট ইনডেক্সে ৮৯তম স্থানে রয়েছে। ভারত থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড—এমনকি তাজিকিস্তানও বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া জটিল করে তুলেছে।
প্রতিবেশী ভারতে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ভ্রমণ করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে পর্যটক ভিসা বন্ধ রেখেছে ভারত। বর্তমানে সীমিত আকারে শুধু চিকিৎসা ও শিক্ষার ভিসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর প্রভাব আরও গভীর, কারণ ইউরোপসহ অনেক দেশের ভিসার জন্য ভারতীয় ডাবল-এন্ট্রি ভিসা প্রয়োজন হয়, যা এখন পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ভারত বলছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া মানবপাচারের অজুহাতে বাংলাদেশিদের অন-অ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ করেছে। থাইল্যান্ড, যেখানে আগে এক সপ্তাহে ই-ভিসা দেওয়া হতো, এখন ৪০-৫০ দিন লাগছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩০-৫০ জন বাংলাদেশিকে ভিসা দিচ্ছে। ভিয়েতনাম পর্যটক ভিসা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। ইতালিতে বাংলাদেশিদের ৬০ হাজারেরও বেশি ভিসা আবেদন ঝুলে আছে। এসব কারণেই বাংলাদেশি পাসপোর্টের চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করছে।
বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মানবপাচারকে দায়ী করলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আসল কারণ হলো কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনিয়ম। বিদেশে কর্মী প্রেরণ নিয়ন্ত্রণ, রিক্রুটিং এজেন্সি সংস্কার, নথি যাচাই—এসবের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে উদ্যোগের গতি ধীর। এর ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স আয়ের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম. তৌহিদ হোসেন স্বীকার করেছেন, “অনেক ক্ষেত্রে দোষ আমাদের নিজেদের… আমাদের মানুষ, আমাদের ব্যবসা।” তবে নাগরিকদের দায়ী করা কোনো সমাধান নয়, বরং সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাই এখন বেশি প্রয়োজন।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে সহযোগিতা কিংবা আরব আমিরাতের সঙ্গে আলোচনা—সব ক্ষেত্রেই সক্রিয় কূটনীতি জরুরি। ইতিবাচক দিক হলো, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক মহলে এখনও বাংলাদেশকে একটি সংস্কারমুখী দেশ হিসেবে দেখা হয়। তবে আসন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
চিকিৎসা, ব্যবসা বা পড়াশোনার জন্য বিদেশে যেতে না পারায় অসংখ্য পরিবার ভোগান্তিতে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। সাধারণ আবেদনকারীরা বিদেশি ভিসা কাউন্টারে মরিয়া ও অবিশ্বাসযোগ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। পশ্চিমা কয়েকটি দেশ যেমন যুক্তরাজ্য ও কানাডা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে।বাংলাদেশ ভ্রমণ
বর্তমানে বাংলাদেশি পাসপোর্ট বিশ্বের অন্যতম দুর্বল অবস্থানে থাকলেও পুরো পরিস্থিতি একেবারেই নেতিবাচক নয়। আন্তর্জাতিক মহলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং শান্তির নোবেলজয়ী পরিচয় এখনও দেশের জন্য ইতিবাচক প্রভাব রাখছে। তার নেতৃত্বে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ খুব শিগগিরই বিশ্বে তার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে—এমন আশা করছেন বিশ্লেষকরা। তথ্যসূত্র : দ্য ডিপ্লোম্যাট