স্বপ্নে ইসতেগফার, দোয়া ও জিকির দেখলে কী বোঝায়?

মানুষ ঘুমের মধ্যে নানা ধরনের স্বপ্ন দেখে। ইসলামী বর্ণনায় সত্য স্বপ্নকে নবুওয়াতের ৪৬ ভাগের এক ভাগ বলা হয়েছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, স্বপ্ন তিন ধরনের—একটি শয়তানের পক্ষ থেকে, যার মাধ্যমে মানুষকে ভয় ও দুশ্চিন্তায় ফেলা হয়; দ্বিতীয়টি জাগ্রত অবস্থায় মানুষ যে বিষয় নিয়ে চিন্তা করে, ঘুমের মধ্যে তারই প্রতিফলন; আর তৃতীয়টি সত্য স্বপ্ন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১৫৫)
তবে সব স্বপ্ন সত্য হয় না। আবার সব স্বপ্নকেও অর্থহীন বলা যায় না। ইসলামী স্বপ্নতত্ত্বে কিছু স্বপ্নের বিভিন্ন প্রতীকী ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। আল্লামা ইবনে সিরিনের ‘স্বপ্নের ব্যাখ্যা’ গ্রন্থে দোয়া, জিকির ও ইসতেগফার সম্পর্কিত কয়েকটি ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।
স্বপ্নে দোয়া পড়তে দেখলে
স্বপ্নে কোনো নির্দিষ্ট দোয়া পড়তে দেখা নিয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যায় ফরজ নামাজ আদায়ের ইঙ্গিতের কথা বলা হয়েছে। এমন কোনো দোয়া পড়তে দেখলে, যাতে আল্লাহ তাআলার নাম নেই, তা লোকদেখানো ইবাদতের ইঙ্গিত হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
শুধু নিজের জন্য দোয়া করতে দেখাকে কোনো কোনো স্বপ্নতত্ত্বে ছেলেসন্তান লাভের ইঙ্গিত বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুরা মরিয়মের ৩ নম্বর আয়াতে হজরত জাকারিয়া (আ.)-এর গোপনে তাঁর প্রতিপালককে ডাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অন্ধকারে আল্লাহকে ডাকতে দেখা
স্বপ্নে অন্ধকারের মধ্যে আল্লাহ তাআলাকে ডাকতে দেখা দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তির ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হজরত ইউনুস (আ.)-এর দোয়ার ঘটনা স্মরণ করা হয়। কোরআনে এসেছে, ‘এবং সে অন্ধকারে থেকে তার প্রতিপালককে ডাকল।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭)
দোয়া কুনুত ও জিকির
স্বপ্নে উত্তম দোয়া পড়তে দেখা দ্বীনের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দোয়া কুনুত পড়তে দেখা আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করতে দেখা আল্লাহর সাহায্য লাভের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা অধিক হারে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে এবং নিপীড়িত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে।’ (সুরা শুয়ারা, আয়াত: ২২৭)
ইসতেগফার করতে দেখলে
স্বপ্নে আল্লাহর কাছে ইসতেগফার করতে দেখা হালাল জীবিকা ও ছেলেসন্তান লাভের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা নুহের ১০ নম্বর আয়াতে এসেছে, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।’
নামাজ শেষ করে আল্লাহর কাছে ইসতেগফার করতে এবং চেহারা কেবলার দিকে রয়েছে—এমন স্বপ্নকে দোয়া কবুলের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কেবলার বিপরীত দিকে মুখ করে ইসতেগফার করতে দেখাকে কোনো পাপের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইসতেগফার থেকে বিরত থাকতে দেখা মুনাফিকির আলামত বলেও কিছু স্বপ্নতত্ত্বে উল্লেখ রয়েছে।
নারীকে ইসতেগফারের কথা বলতে দেখা
স্বপ্নে কোনো নারীকে ‘তোমার গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো’—এ কথা বলতে দেখা হলে তাকে কোনো গুনাহ বা অশালীন কাজের জন্য অপবাদ দেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর সঙ্গে জুলেখার ঘটনার উদাহরণও উল্লেখ করা হয়।
সুবহানাল্লাহ ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
স্বপ্নে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলতে দেখা দুশ্চিন্তা দূর হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়তে দেখাকে চলমান দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি এবং ঈমানের দৃঢ়তার ইঙ্গিত বলা হয়েছে।
আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ
স্বপ্নে ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে দেখা মনের কামনা-বাসনা পূরণ এবং শত্রুর ওপর বিজয়ের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলতে দেখাকে আলো ও দ্বীনের আলোকপ্রাপ্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে দেখা অধিক নেয়ামত ও শক্তি লাভের ইঙ্গিত বলে উল্লেখ রয়েছে।
স্বপ্নদ্রষ্টা যদি কোনো প্রশাসক বা শাসক হন, তাহলে তাকে শুকরিয়া আদায় করতে দেখাকে সমৃদ্ধ ও সচ্ছল কোনো এলাকার দায়িত্ব পাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুরা সাবার ১৫ নম্বর আয়াতের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়।
তবে স্বপ্নের ব্যাখ্যা ব্যক্তির পরিস্থিতি, মানসিক অবস্থা, সময় ও স্বপ্নের অন্যান্য বিষয়ের ওপরও নির্ভর করতে পারে। তাই কোনো স্বপ্নের ব্যাখ্যাকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে না দেখে প্রচলিত ইসলামী স্বপ্নতত্ত্বের একটি ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সূত্র: আল্লামা ইবনে সিরিনের ‘স্বপ্নের ব্যাখ্যা’ গ্রন্থ থেকে সংক্ষেপিত।