বাহ্যিক সুখের পরও কেন থেকে যায় মনের শূন্যতা?

মানুষের জীবন শুধু শরীর ও মস্তিষ্কের চাহিদা পূরণেই সীমাবদ্ধ নয়। খাবার, পোশাক, বাসস্থান, নিরাপত্তা কিংবা জীবিকা—এসব যেমন মানুষের দৈহিক প্রয়োজন মেটায়, তেমনি তার ভেতরে রয়েছে আরও গভীর এক জগতের চাহিদা। সেই জায়গা থেকেই অনেক সময় প্রশ্ন আসে—সবকিছু থাকার পরও কেন যেন ভেতরটা শূন্য লাগে?
ইসলামি চিন্তায় মানুষের এই অন্তর্জগতকে ‘কলব’ বা অন্তরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এটি কেবল শারীরিক অঙ্গের কথা নয়; বরং মানুষের উপলব্ধি, বিবেক ও আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কোরআনে এমন অন্তরের কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ সত্যকে উপলব্ধি করে। মানুষ যখন এই আধ্যাত্মিক উপলব্ধির চর্চা থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার অন্তর ধীরে ধীরে কঠিন ও অসাড় হয়ে পড়তে পারে।
আমরা দৈনন্দিন জীবনে মস্তিষ্ক ব্যবহার করে নানা সমস্যা সমাধান করি। কীভাবে আয় বাড়ানো যায়, কোথায় বসবাস করা হবে, কীভাবে নিরাপদ থাকা যায় কিংবা কোন সিদ্ধান্তটি বাস্তবসম্মত—এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হয়। কিন্তু মানুষের প্রয়োজন শুধু বস্তুগত নয়। জীবনের অর্থ কী, আমি কেন পৃথিবীতে এসেছি, সত্য কোথায় এবং আমার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক কেমন—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাগিদও মানুষের ভেতরে কাজ করে।
সবকিছু পেয়েও শূন্যতা কেন?
অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করছে, ভালো খাবার খাচ্ছে, ঘুরতে যাচ্ছে কিংবা নিজের পছন্দের অনেক কিছুই অর্জন করছে। তবু দিন শেষে তার ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি বা শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।
এর কারণ হতে পারে, বাহ্যিক জীবনের প্রয়োজনগুলো পূরণ হলেও ভেতরের আধ্যাত্মিক চাহিদাগুলো অপূর্ণ রয়ে গেছে। মানুষের আত্মিক জগতও এক ধরনের খোরাক চায়। ইবাদত, আত্মশুদ্ধি, সত্যের অনুসন্ধান, স্রষ্টার স্মরণ এবং জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবনা সেই চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থাৎ আনন্দের সব উপকরণ কাছে থাকার পরও যদি অন্তরের প্রয়োজন উপেক্ষিত হয়, তাহলে মানুষের মনে অপূর্ণতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
সত্যের সন্ধানে এক মনোবিজ্ঞানীর যাত্রা
রুহ বা আত্মার প্রকৃতি বোঝার অনুসন্ধানে মনোবিজ্ঞানী ড. আবদুল্লাহ রথম্যানের জীবনপথকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য তিনি নানা পরিবেশে সময় কাটান এবং সেসব মানুষের আধ্যাত্মিক অনুশীলন কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন।
ভারতীয় ধর্মীয় পরিবেশ থেকে শুরু করে জ্যামাইকার শামানিক সংস্কৃতি, ইহুদি ও খ্রিস্টীয় ধর্মীয় চর্চা—বিভিন্ন পরিমণ্ডল সম্পর্কে তিনি জানার চেষ্টা করেন। শুধু বই পড়ে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির মানুষের জীবন ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের কাছাকাছি গিয়ে তিনি বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করেন।
পরবর্তীতে ইসলামি মনোবিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে তিনি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। পরে ইসলাম গ্রহণ করে সুদানে একজন শায়খের অধীনে আরবি ও ইসলামি জ্ঞানচর্চা করেন। বর্তমানে তিনি কেমব্রিজ ইসলামিক কলেজের ইসলামিক সাইকোলজি প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
তার এই যাত্রা দেখায়, মানুষের ভেতরের প্রশ্ন অনেক সময় তাকে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পথে নিয়ে যেতে পারে। জীবনের বাহ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি মানুষ নিজের অস্তিত্ব, আত্মা ও স্রষ্টাকে নিয়েও জানতে চায়।
অন্তরের যত্নও প্রয়োজন
মানুষ তার শরীরের যত্ন নেয়, মস্তিষ্ককে কাজে লাগায়, পেশাগত দক্ষতা বাড়ায় এবং বস্তুগত জীবনের উন্নতির চেষ্টা করে। কিন্তু এর পাশাপাশি অন্তরেরও যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।
অন্তরের এই চাহিদাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করলে বাহ্যিক সাফল্যও সব সময় পরিপূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারে না। তাই জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, স্রষ্টার স্মরণ এবং নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করার জন্য কিছুটা সময় রাখা জরুরি।
কারণ মানুষের প্রয়োজন শুধু বেঁচে থাকা নয়; জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া এবং নিজের অন্তরের প্রশান্তিও তার গভীর প্রয়োজনের অংশ।