মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর: আকাশে বিমান দেখলেই ফিরে আসে আতঙ্ক

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের এক বছর পেরিয়ে গেছে। সময় এগিয়ে চললেও নিহতদের পরিবার ও আহতদের জীবনে সেই দিনের বিভীষিকা আজও অমোচনীয়। হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের স্মৃতি, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর ভয়াবহ সেই বিকেলের আতঙ্ক এখনও তাড়া করে বেড়ায় তাদের।
গত বছরের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হলে পাইলট, একজন শিক্ষিকা এবং ২৮ জন শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও অনেকে। দগ্ধ ও আহতদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর অনেকেই সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরলেও শরীরের ক্ষতের পাশাপাশি মানসিক ট্রমা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
এক বছর পর আহত শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহত ৪৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন ছাড়া সবাই নিয়মিত ক্লাস করছে। তবে আকাশে বিমান উড়ে গেলে কিংবা স্কুল ছুটির সময় ঘনিয়ে এলে অনেকের মধ্যেই আতঙ্ক ফিরে আসে। একই উদ্বেগ কাজ করে অভিভাবকদের মনেও।
অন্যদিকে, নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলোর কাছে সময় যেন এখনও থেমে আছে সেই দিনের মধ্যেই। অনেক স্বজন মাঝেমধ্যে স্কুলে এসে হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের স্মৃতির কাছে দাঁড়িয়ে থাকেন। কারও কাছে সন্তান বেঁচে আছে ছবিতে, কারও কাছে স্মৃতির ভেতর। তাদের অভিযোগ, এক বছর পার হলেও এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রকৃত বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি। সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে তারা বলছেন, কোনো আর্থিক সহায়তা নয়—তাদের একমাত্র দাবি সুষ্ঠু বিচার ও দায়ীদের জবাবদিহি।
দুর্ঘটনার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার নয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। প্রায় তিন মাসের তদন্ত শেষে ১৫০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ১৬৮টি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কমিশন ৩৩ দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, উড্ডয়নজনিত ত্রুটির কারণে প্রশিক্ষণ চলাকালে পরিস্থিতি পাইলটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। ভবিষ্যতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বরিশাল ও বগুড়া বিমানঘাঁটির রানওয়ে সম্প্রসারণেরও সুপারিশ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। পর্যাপ্ত সংখ্যক সিঁড়ি না থাকায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে বলেও তদন্তে পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।
এদিকে, ট্র্যাজেডির প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দুই দিনের স্মরণ কর্মসূচি পালন করছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। কর্মসূচির অংশ হিসেবে দোয়া মাহফিল, কবর জিয়ারত, এক মিনিট নীরবতা এবং নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া মঙ্গলবার (২১ জুলাই) প্রতিষ্ঠানের সব শাখায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।