স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বার্তা: ভয় নয়, লিভার যত্নে সচেতনতা

সম্প্রতি কারিনা কায়সার এর আকস্মিক মৃত্যু দেশজুড়ে লিভারের রোগ ও হেপাটাইটিস নিয়ে এক নতুন আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন—একদম সুস্থ মানুষ কীভাবে মাত্র ১-২ দিনের মধ্যে লিভার ফেইলিউর (Acute Liver Failure) হয়ে মারা যেতে পারেন? তবে লিভার বিশেষজ্ঞরা (Hepatologist) বলছেন, একদম সুস্থ একটি লিভার সাধারণত হঠাৎ করে নষ্ট হয় না। এর পেছনে প্রায়শই লুকিয়ে থাকে দীর্ঘদিনের নীরব লিভারের ক্ষতি, বিশেষ করে ফ্যাটি লিভার, যা কোনো পূর্ব লক্ষণ ছাড়াই লিভারকে ভেতর থেকে দুর্বল করে রাখে।
ফ্যাটি লিভার: নীরব ঘাতকের সাতটি ধাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি লিভার কখনোই হঠাৎ করে লিভার ধ্বংস করে না, বরং এটি বছরের পর বছর ধরে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়:
১. Simple Fatty Liver: লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে, যার কোনো বাহ্যিক উপসর্গ থাকে না।
২. NAFLD: চর্বির পরিমাণ বেড়ে লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়।
৩. NASH: চর্বির পাশাপাশি লিভারের ভেতরে তীব্র প্রদাহ (Inflammation) এবং কোষ নষ্ট হওয়া শুরু হয়।
৪. Liver Fibrosis: প্রদাহের কারণে লিভারের টিস্যুগুলো শক্ত হতে থাকে এবং রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।
৫. Cirrhosis: লিভারের বড় অংশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় পেটে পানি আসা, রক্তবমি ও মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দেয়।
৬. Liver Failure: লিভার তার শরীরের বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ এবং প্রোটিন তৈরির কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
৭. Liver Cancer: দীর্ঘদিনের সিরোসিস ও অবহেলার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
হেপাটাইটিসের প্রকারভেদ ও প্রাণঘাতী হওয়ার কারণ
"Hepatitis" শব্দের অর্থ হলো লিভারের প্রদাহ। এটি মূলত পাঁচ ধরনের ভাইরাসের (A, B, C, D, E) কারণে হতে পারে। এর মধ্যে হেপাটাইটিস A এবং E সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। একজন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এটি কয়েক সপ্তাহে ভালো হয়ে গেলেও নিচের ৪টি ক্ষেত্রে এটি একিউট লিভার ফেইলিউর বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে:
-
আগে থেকেই শরীরে সুপ্ত Fatty Liver বা Cirrhosis থাকলে।
-
গর্ভাবস্থায় (বিশেষ করে হেপাটাইটিস E ভাইরাসের আক্রমণ গর্ভবতী মা ও শিশুর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক)।
-
শিশু, বয়োবৃদ্ধ এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম।
অন্যদিকে, হেপাটাইটিস B, C এবং D ছড়ায় মূলত অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ, একই সিরিঞ্জ বা ব্লেড বারবার ব্যবহার, ট্যাটু বা পিয়ার্সিংয়ের অস্বাস্থ্যকর সরঞ্জাম এবং অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। এগুলো শরীরে কোনো লক্ষণ ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে লিভার ধ্বংস করতে পারে।
লিভার আক্রান্ত হওয়ার সাধারণ লক্ষণসমূহ
শুরুতে রোগটি নীরব থাকলেও ধীরে ধীরে শরীরে কিছু সংকেত দেখা দেয়, যা মানুষ প্রায়শই অবহেলা করে:
-
তীব্র ক্লান্তি ও শারীরিক দুর্বলতা।
-
ক্ষুধামন্দা, গ্যাস ও বমি বমি ভাব।
-
ডান পাশের পেটের উপরিভাগে মৃদু ব্যথা।
-
চোখ ও প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হওয়া (জন্ডিস)।
-
হঠাৎ মানসিক বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক আচরণ (যা লিভারের বিষাক্ত পদার্থ মস্তিষ্কে পৌঁছানোর লক্ষণ)।
যেসব ভুলে বাড়ছে মরণব্যাধির ঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, আমাদের দৈনন্দিন কিছু অসচেতনতাই এই রোগের পথ সুগম করছে: ১. রাস্তার ধারের অস্বাস্থ্যকর খোলা খাবার ও ফুটানো ছাড়া দূষিত পানি পান করা।
২. একই ব্লেড বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করা।
৩. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত পেনকিলার, স্টেরয়েড বা মানহীন ভেজাল হারবাল ওষুধ সেবন।
৪. অতিরিক্ত ফাস্টফুড বা জাঙ্ক ফুড খাওয়া এবং শারীরিক পরিশ্রম না করার কারণে স্থূলতা ও ফ্যাটি লিভারকে অবহেলা করা।
আধুনিক চিকিৎসা ও বাঁচার উপায়
বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করে বলেছেন, "হেপাটাইটিস বা লিভারের রোগ মানেই মৃত্যু"—এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে হেপাটাইটিস B, C, ফ্যাটি লিভার এবং লিভার ইনফেকশনের জন্য অত্যন্ত আধুনিক ও কার্যকর ওষুধ রয়েছে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় (Screening) করা গেলে লিভারের ক্ষতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
"কবরের নীরবতা শুরু হওয়ার আগেও শরীর অনেকবার সতর্ক করে, কিন্তু মানুষ ব্যস্ত থাকে অবহেলায়।" তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ—ভয় পেয়ে আতঙ্কিত না হয়ে, সময় থাকতে লিভার ফাংশন টেস্ট (जैसे: SGPT, HBsAg, Ultrasonography) করুন। আজই নিজের ও পরিবারের সুরক্ষায় সচেতন হোন।
দৈএনকে/জে, আ