দুধের শিশু নিয়ে কারাগারে মা, জেলের গেটে কাঁদছে দুই সন্তান

প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো হলো এক নারীকে, যাঁর কোলে দেড় বছর বয়সী এক অবুঝ শিশু। আর কারা ফটকের বাইরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে স্কুলপড়ুয়া আরও দুই সন্তান। মায়ের কারাগারে যাওয়ার খবর পেয়ে স্কুল থেকে ছুটে এসেছিল তারা। একনজর দেখার পর মাকে বিদায় জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে দুই ভাইবোন।
সোমবার বিকেলে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের সামনে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। মারামারির একটি মামলায় জামিন নামঞ্জুর হওয়ায় ফারহানা আক্তার নামের ওই নারীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আইনি বাধ্যবাধকতায় ছোট সন্তানকে মায়ের সঙ্গে রাখার অনুমতি মিললেও মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে হলো অপর দুই স্কুলপড়ুয়া সন্তানকে।
জমি নিয়ে বিরোধ ও পাল্টা মামলা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাহাপুর গ্রামের চাঁনগাজী হাওলাদার বাড়ির ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে প্রতিবেশী আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়ার জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। এর জেরে গত ৯ এপ্রিল আফতাবের নেতৃত্বে ইসমাইলের বাড়িতে হামলা ও নারীদের মারধরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ইসমাইল হোসেন মামলা করেন এবং ১৪ এপ্রিল পুলিশ আফতাবকে গ্রেপ্তার করে।
পরদিন ১৫ এপ্রিল আফতাবের ভাই মাহাতাব উদ্দিন ভূঁইয়া ফারহানা আক্তারসহ ১০ জনকে আসামি করে একটি পাল্টা মামলা দায়ের করেন।
সোমবার ওই মামলায় হাজিরা দিতে লক্ষ্মীপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যান আসামিরা। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত সদরের বিচারক শাহ জামাল আসামি ফারহানা আক্তার ও জহির উদ্দিনের জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালতের পেশকার দেলোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মহসিন কবির জানান, ফারহানা আক্তারের কোলে দুধের শিশু। বাইরে থাকা দুই সন্তান দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। পরীক্ষা শেষ করেই তারা মাকে দেখতে কারা ফটকে ছুটে আসে। বাদীপক্ষ সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ এনে এই মামলা করেছে। আমরা বিশেষ ব্যবস্থায় পুনরায় জামিন আবেদন করব।" এই আইনজীবীই কারা ফটকে শিশুদের কান্নার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন, যা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অন্যদিকে, বাদীপক্ষের আইনজীবী জসিম উদ্দিনের দাবি, প্রধান আসামি ফারহানা লোহার রড দিয়ে বাদী মাহাতাব উদ্দিনের মাথায় আঘাত করেন। এতে বাদীর মাথা ফেটে মগজ বের হয়ে যায় এবং তিনি ন্যায়বিচারের আশায় মামলা করেছেন।
তবে মামলার বাদী মাহাতাব উদ্দিন মুঠোফোনে জানান, আসামিদের হামলায় মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। শুরুতে মাথা ফেটে মগজ বের হওয়ার কথা বলা হলেও চিকিৎসকরা পরে জানিয়েছেন, সেটি মগজ নয়, চর্বি ছিল।
ফারহানা আক্তারের স্বামী ইসমাইল হোসেন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ছোট ছেলে মায়ের সঙ্গে জেলে গেছে, আর স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তান বাড়িতে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে শিশুরা মানসিকভাবে চরম ভেঙে পড়েছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আদালতের নির্দেশে একটি মামলার আসামি হিসেবে দেড় বছরের শিশু সিয়াম ও তার মা ফারহানাকে গতকাল বিকেলে কারাগারে গ্রহণ করা হয়েছে।