কিয়ামতের ময়দানে ন্যায়বিচার কোরআনে যেভাবে বর্ণিত

সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ৭১ অনুযায়ী আল্লাহর নির্দেশ
কিয়ামতের দিন, প্রত্যেক মানুষের আমলনামা ও ন্যায়বিচারের ঘটনা কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ৭১-এ বলা হয়েছে:
“যখন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নেতাসহ আহ্বান করব। যাদেরকে ডান হাতে তাদের আমলনামা দেওয়া হবে, তারা তাদের আমলনামা পাঠ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুরের আঁটির ফাটলে সুতো বরাবরও যুলুম করা হবে না।”
(ইংরেজি ও সরল অনুবাদ)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষকে তাদের নেতা বা ইমামের মাধ্যমে আহ্বান করবেন। যাদের ডান হাতে তাদের আমলনামা প্রদান করা হবে, তারা তাদের নিজের আমলনামা দেখে জানবে যে, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করা হচ্ছে এবং সামান্যতমও অন্যায় করা হবে না।
ইমামের অর্থ: নেতা না গ্রন্থ?
আয়াতে ব্যবহৃত ‘ইমাম (إمام)’ শব্দের ব্যাখ্যায় বিভিন্ন মত রয়েছে। কিছু তাফসীরবিদ্র প্রমাণ করেন, এখানে ইমাম দ্বারা বোঝানো হয়েছে গ্রন্থ, কারণ কোরআনের অন্য স্থানে বলা হয়েছে:
“আর যাবতীয় বস্তুই আমি সুস্পষ্ট গ্রন্থে গুনে রেখেছি।” (সুরা ইয়াসীন, আয়াত ১২)
অন্য দিকে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও মুজাহিদর মত অনুযায়ী, ইমাম বলতে নেতা বা নবীর অর্থও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নিজ নিজ নেতা বা নবীর মাধ্যমে আহ্বান করা হবে। যেমন: ইবরাহীম আলাইহিস সালামের অনুসারী দল এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী দল।
এ কারণে, কিছু তাফসীরবিদ্র মতে, আয়াতের ইমাম শব্দ দুটি অর্থ বহন করে—গ্রন্থ ও নেতা উভয়ই।
ডান হাতে আমলনামা: ন্যায়বিচারের প্রতীক
আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, যাদের ডান হাতে তাদের আমলনামা দেওয়া হবে, তারা তা পড়ে দেখবে। এতে বোঝানো হয়েছে, যারা ভালো আমল করেছে, তাদের প্রতি কোনো প্রকার অন্যায় বা ক্ষতি হবে না। আল্লাহর ন্যায়পরায়ণ বিচার তাদের জীবনের প্রতিটি কাজের সঠিক হিসাব রাখবে।
এটি কোরআনের অন্যান্য আয়াতের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ:
“যখন যাকে তার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, ‘লও, আমার আমলনামা পড়ে দেখ; আমি জানতাম যে, আমাকে আমার হিসেবের সম্মুখীন হতে হবে।’” (সুরা আল-হাক্কাহ, আয়াত ১৯-২০)
“কিন্তু যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, হায়! আমাকে যদি দেয়াই না হত আমার আমলনামা, এবং আমি যদি না জানতাম আমার হিসেব!” (সুরা আল-হাক্কাহ, আয়াত ২৫-২৬)
খেজুরের আঁটির ফাটল পর্যন্ত ন্যায়
আয়াতের শেষে ব্যবহৃত ‘ফাতীল (فَتِيْلٌ)’ শব্দটি হলো খেজুরের আঁটির অতি সূক্ষ্ণ ও পাতলা সুতো। এখানে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহর ন্যায়ের আওতায় সৃষ্টির ওপর কোনো সামান্যতমও অন্যায় করা হবে না। অর্থাৎ, মানুষকে ক্ষুদ্রতম পরিমাণেও কোনো অত্যাচার করা হবে না।
ইসলামী তাফসীরের দৃষ্টিভঙ্গি
ইবন কাসীরসহ প্রখ্যাত তাফসীরবিদ্র মতে, কিয়ামতের দিন সকল সম্প্রদায়ের নবী ও নেতা উপস্থিত থাকবেন এবং তারা সাক্ষী হিসেবে মানুষের আমলনামার সত্যতা প্রমাণ করবেন। এভাবে, মানুষ এবং নবীর সাক্ষ্য মিলিয়ে সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।
সালফে সালেহীনরা বলেন, যারা নবীর প্রকৃত অনুসারী, তাদের জন্য সর্বোচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে। কারণ তাদের নেতা হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।