গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী: শুরু হচ্ছে সাংবিধানিক সংস্কারের পথচলা

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) একযোগে ২৯৯ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ২০৯ আসন পেয়েছে এরইমধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিএনপি। পাশাপাশি প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। এর ফলে দেশে
ব্যাপক সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। কার্যত নতুন সংসদ ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আওতায় থাকা প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে আইনত বাধ্য থাকবে।
গণভোটের ফল অনুযায়ী, নতুন সংসদ গঠনের পর ১৮০ দিনের মধ্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। এই সনদে রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা জোরদারের লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সনদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হতে পারবেন না। এছাড়া, কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না—এমন সীমাবদ্ধতাও আরোপ করা হয়েছে।
এছাড়া সংখ্যানুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। সনদ অনুযায়ী, এসব নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে আর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হবে না, ফলে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমানোর একটি কাঠামো তৈরি হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয় দেশের শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কারের জনসমর্থনেরই প্রতিফলন। এখন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এসব সংস্কার বাস্তবায়নই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
উল্লেখযোগ্য সংস্কার প্রস্তাব
১। সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল গঠন: গণভোটের রায় অনুযায়ী, প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য একটি সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল গঠন করতে হবে।
২। সংসদে আসবে দুইকক্ষ: ভবিষ্যতে সংসদ হবে দুই কক্ষের। নির্বাচিত ৩০০ এবং মনোনীত নারী ১০০ সদস্যের বাইরে উচ্চ কক্ষে ভোটের সংখ্যানুপাতে আরও ১০০ সদস্য মনোনয়ন দেওয়া হবে। উচ্চকক্ষ সংবিধান সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মতামত দেবেন। সংবিধান সংশোধন করতে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন লাগবে।
৩। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা: সব সাধারণ নির্বাচনের আগে একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রস্তাবনাটি এই সংস্কারের অন্যতম প্রধান অংশ। এই সংসদকে জুলাই সনদের আলোকে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।
৪। মৌলিক অধিকার ও বিচার বিভাগ: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করা হবে এবং ইন্টারনেট পরিষেবাকে নিরবচ্ছিন্ন রাখা মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য হবে। কেউ চাইলেও আর ইন্টারনেট বন্ধ করতে পারবে না।
৫। সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে থাকবেন না, এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে।
৬। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতিকে কাজ করতে হয়। তবে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর নানবিধ সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ৬টি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব থেকে ১৬৬টি সুপারিশকে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো নিয়ে ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনা হয়। এরমধ্যে থেকে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়ে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ। ৮৪ প্রস্তাবের ৪৮টি সংবিধানসম্পর্কিত। এগুলো অধ্যাদেশ বা কোনো আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। যার কারণে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টিকে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে চিহ্নিত করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
বাস্তবায়নে তিনটি স্তর
১। আইনি ভিত্তি দিতে আদেশ জারি। গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন রাষ্ট্রপতি।
২। বাস্তবায়নের দ্বিতীয় স্তরে হয়েছে গণভোট। এই গণভোট হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কারসম্পর্কিত অংশ নিয়ে।
৩। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন তৃতীয় স্তর শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করবে।