রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
Natun Kagoj

পলাশ-শিমুলে আগুনরাঙা বসন্তের সূচনা

পলাশ-শিমুলে আগুনরাঙা বসন্তের সূচনা
ছবি- সংগৃহীত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে...
আজ পয়লা ফাল্গুন (১৪ ফেব্রুয়ারি)। বাংলা সনের একাদশ মাস ফাল্গুনের প্রথম দিন এবং ঋতুরাজ বসন্তের সূচনা। শীতের জড়তা কাটিয়ে প্রকৃতিতে আসে নতুন প্রাণের সঞ্চার, রঙিন ফুলে-ফলে ভরে ওঠে চারদিক।

বাংলাদেশের প্রকৃতিতে বসন্ত মানেই রঙের উচ্ছ্বাস। গাছে গাছে শিমুল, পলাশ ও কৃষ্ণচূড়ার আগুনরাঙা ফুল, কোকিলের ডাক আর মৃদুমন্দ বাতাসে বদলে যায় পরিবেশ। প্রকৃতির এই রূপান্তর মানুষের মনেও আনে নতুন উদ্দীপনা।

পয়লা ফাল্গুন ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় বসন্ত উৎসব। হলুদ ও বাসন্তী রঙের পোশাকে সেজে মানুষ অংশ নেয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, কবিতা ও নাচে। বিশেষ করে ছায়ানট ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন বসন্ত বরণে আয়োজন করে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান।

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে ফাল্গুন মাস প্রকৃতির নবজাগরণের প্রতীক। নতুন প্রেম, নতুন আশা আর নতুন স্বপ্নের বার্তা নিয়েই আসে ঋতুরাজ বসন্ত। তাই পয়লা ফাল্গুন শুধু একটি দিন নয়, এটি বাঙালির হৃদয়ে রঙ ছড়িয়ে দেওয়া এক অনন্য উৎসব।

বাংলাদেশে ফাল্গুনের প্রথম দিনটি ‘পয়লা ফাল্গুন’ ও ‘বসন্ত বরণ উৎসব’ হিসেবে উদযাপিত হয়। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ এ বসন্ত বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এরপর থেকে প্রতিবছরই রঙিন শোভাযাত্রা, গান, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় দিনটি বর্ণিল হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে পালিত হয় Valentine's Day। বাংলাদেশেও এ দিনটি ভালোবাসা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়। ফলে পয়লা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস একসঙ্গে মিলে সৃষ্টি করে এক বিশেষ আবহ।

ঐতিহাসিকভাবে ‘ফাল্গুন’ নামটি এসেছে ‘ফাল্গুনী’ নক্ষত্র থেকে। প্রাচীনকালে চন্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষ অনুসরণ করা হতো এবং ফাল্গুন ছিল পূর্ণ চন্দ্রের মাস। ১৯৫০-৬০ দশকে আনুষ্ঠানিকভাবে পয়লা ফাল্গুন উদযাপন শুরু হয়। সে সময় পাকিস্তানি সংস্কৃতির প্রভাব থেকে নিজেদের আলাদা করে বাঙালি পরিচয় জোরালো করতে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা ও বসন্ত উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক চর্চা জোরদার হয়।

বসন্ত নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য গান ও কবিতা। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “ফুল ফুটুক, আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত।” বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম গেয়েছেন, “বসন্ত বাতাসে সই গো…”। আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তকে ঘিরে রচনা করেছেন বহু গান ও কবিতা, যা আজও বাঙালির প্রাণে অনুরণিত।

তবে বসন্ত শুধু উৎসবের নয়, ইতিহাস ও আত্মত্যাগেরও স্মারক। ফাল্গুনের লাল শিমুল ও কৃষ্ণচূড়া মনে করিয়ে দেয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের কথা। এ মাসেই মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে প্রাণ দেন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অসংখ্য শহীদ। তাঁদের আত্মত্যাগের পথ ধরেই এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

তাই পয়লা ফাল্গুন শুধু ঋতুর আগমন নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ভালোবাসা ও দ্রোহের এক অনন্য প্রতীক।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন