গোল্ড মেডেলিস্ট পুলিশ সদস্যের আর্তনাদ ও চাকরি ছাড়ার আকুতি

কর্তব্যের কঠোর শৃঙ্খল যখন মানবিকতাকে হার মানায়, তখন জন্ম নেয় এক করুণ আখ্যান। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুলিশ সদস্য মেহেদী হাসানের একটি আবেগঘন ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমবেদনার সৃষ্টি হয়েছে। মেহেদী হাসানের অভিযোগ, তার শিশু সন্তান গুরুতর অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও বারবার আবেদন করার পর তাকে ছুটি দেয়নি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তার বদলে অজুহাত দেওয়া হয়েছিল 'নির্বাচনকালীন ডিউটি'র ব্যস্ততাকে।
"সন্তান মরে গেলেও ছুটি নেই"
মেহেদী হাসান বাংলাদেশ পুলিশের একজন গর্বিত সদস্য। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ বাহিনীর উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। ঠিক সেই মূহুর্তেই মেহেদী হাসানের আদরের ছোট ছেলেটি অসুস্থ হয়ে মারা যায়। বাবার মন যখন সন্তানের লাশের পাশে থাকতে চাইছিল, তখন রাষ্ট্রের নির্দেশে তাকে থাকতে হয়েছে কর্মস্থলে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে সন্তানের মৃত্যুর কথা জানিয়ে ছুটির আকুতি জানালেও মেলেনি সাড়া। তাদের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়— নির্বাচন সামনে, এই সময়ে কাউকে ছুটি দেওয়া সম্ভব নয়।
ছেলের মৃত্যুর পর মেহেদী হাসান সামাজিক মাধ্যমে লেখেন:
“ছুটি চাইছিলাম পাইলাম না, আমার ছেলেটা মারা গেল!!! ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশ। আমি না থাকলে নির্বাচন আটকে যেতো!! কী জবাব দিবো বউকে???"
এক অসহায় বাবার আর্তি ও চরম বাস্তবতা
পরবর্তীতে অন্য এক পোস্টে মেহেদী হাসানের অসহায়ত্ব আরও প্রকট হয়ে ধরা দেয়। তিনি জানান, তার স্ত্রী এখনো জানেন না যে তাদের কলিজার টুকরো আর নেই। চিকিৎসকদের পরামর্শে এই সত্যটি গোপন রাখা হয়েছে। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে যে, একদিকে সন্তানের লাশ আর অন্যদিকে তাকে কালকেই 'নাইট ডিউটি'তে যোগ দিতে হবে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে সাহায্য চেয়ে লিখেছেন:
"বাবুর জন্য কেনা জিনিসগুলো কী করবো বলতে পারেন? আমার আবার কালকে নাইট ডিউটি আছে, আমার ছেলের লাশটা এম্বুলেন্সে করে কেউ আমার কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন?? গরীব মানুষের সন্তান আমি, চাকরিটা খুব দরকার।"
মেধার অবমূল্যায়ন ও নতুন জীবনের সন্ধান
বিস্ময়কর তথ্য হলো, মেহেদী হাসান কোনো সাধারণ শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষ নন। তিনি স্নাতক (অনার্স) পরীক্ষায় গোল্ড মেডেল প্রাপ্ত একজন মেধাবী ছাত্র। তার অনার্সে সিজিপিএ ৩.৭২ এবং মাস্টার্সে ৩.৯০। প্রশাসনিক কাজে ১০ বছরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও আজ তাকে স্রেফ বেঁচে থাকার তাগিদে এবং "চাকরিটা খুব দরকার" বলে এই অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে। পুলিশের এই কঠোর পরিবেশে এখন তার "নিঃশ্বাস নেওয়া কষ্টকর" হয়ে পড়েছে। তিনি এই পেশা ছেড়ে সাধারণ কোনো কাজ খুঁজছেন, যেখানে অন্তত তিনি একজন মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারবেন।
প্রশাসনিক অসংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন
এই ঘটনাটি সামনে আসার পর নেটিজেনরা পুলিশ বাহিনীর প্রশাসনিক কাঠামোর কড়া সমালোচনা করছেন। অনেকেই বলছেন, নির্বাচন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একজন বাবার কাছে তার মৃত সন্তানের লাশের চেয়ে বড় কোনো "ডিউটি" থাকতে পারে না। মেহেদী হাসানের মতো তৃণমূল পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক সংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতনদের আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন বিশিষ্টজনেরা।
নির্বাচন সফল হবে ঠিকই, কিন্তু মেহেদী হাসান হারিয়েছেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এই শোক কোনো পদক বা রাষ্ট্রীয় ধন্যবাদ দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়। এই ঘটনাটি আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।