পর্যটক সার্ভিসে ফিরে এসেছে ‘পিএস মাহসুদ’ নৌযান

রাষ্ট্রীয় নৌ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিসি’র ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল চালিত যাত্রীবাহী নৌযান ‘পিএস মাহসুদ শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টায় ‘পর্যটক সার্ভিস’ হিসেবে ঢাকা থেকে ৩২ যাত্রী নিয়ে যাত্রা করে চাঁদপুর হয়ে এখন বরিশালের উদ্দেশ্যে মেঘনা অতিক্রম করেছে। ৯৬০ যাত্রী বহনক্ষম নৌযানটিতে প্রথম শ্রেণির ১২টি কক্ষে ২৪ জন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ১০টি কক্ষের ২০ শয্যার মধ্যে ৪ জন এবং ৯শতাধিক যাত্রীর ডেক শ্রেণিতে মাত্র ৪জন যাত্রী ভ্রমণ করছে বলে জানা গেছে।
পিএস মাহসুদ’ পূর্ব নির্ধারিত ১৫ নভেম্বরের পরে ২১ নভেম্বরের পরিবর্তে আজ (২৮ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা থেকে বরিশালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। তবে নৌযানটিতে যাত্রীসংখ্যা ছিল হতাশাব্যঞ্জক।
দুপুর ১টার দিকে মাহসুদ চাঁদপুর ঘাটে নোঙর করে দশ মিনিট অপেক্ষার পর বরিশালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। তবে চাঁদপুর থেকে নৌযানটিতে কোনো যাত্রী আরোহণ করেনি। ফলে ১০মিনিট অপেক্ষার পরেই পিএস মাহসুদ,নোঙর তুলে বরিশালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে।
মূলত চট্টগ্রাম থেকে সকাল ১০টায় ছেড়ে আসা ট্রেনটি লাকশাম হয়ে চাঁদপুরে পৌঁছে থাকে দুপুর ৩টায়। সাধারণ যাত্রীদের দাবি বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ যদি রেলওয়ের সাথে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে অন্তত শুক্রবারের ট্রেনটি চট্টগ্রাম থেকে সকাল ৮টায় ছেড়ে চাঁদপুরে দুপুর ১টার মধ্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে পারত, তবে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক যত্রী এ নৌযানটিতে আরোহণের সুযোগ পেত। এতেকরে নৌযানটির রাজস্ব অনেকাংশে বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি চট্টগ্রামের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজতর হবে বলেও মনে করছেন সাধারণ যাত্রীগণ।
১৯৩৮ সালে কোলকাতার গার্ডেনরীচ শীপ বিল্ডার্সে সংযোজিত পিএস মাহসুদ সহ অন্তত ২০টি প্যাডেল চালিত যাত্রীবাহী নৌযান দেশ ভাগের পরে ‘পাকিস্তান রিভার স্টিমার্স পিআরএস-র হিস্যায় পরে। স্বাধীনতার পরে পিআরএস সহ ৭টি নৌ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান নিয়ে রাষ্ট্রীয়,বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিপরিবহন করপোরেশন-বিআইডব্লিউটিসি গঠিত হয়। মূলত এসব বাস্পীয় পডেল নৌযান কয়লার সাহায্যে চলাচল করলেও স্বাধীনতার পরে অনেক গুলোই কয়লার পরিবর্তে ফার্নেস অয়েলে পরিচালন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করা হয়।
তবে ১৯৭৮ থেকে ৮২ সালে বেলজীয় সরকারের আর্থিক ও কারিগড়ি সহায়তায় পিাএস মাহসুদ,ছাড়াও পিএস অস্ট্রিচ ও পিএস লেপচা কেও কয়লা চালিত ইঞ্জিনের পরিবর্তে এবিসি মেরিন ডিজেল ইঞ্জিন সংযোজন সহ পরিপূর্ণ পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ হাইড্রোলিক গীয়ারের কারণে মাত্র ৩ হাজার ঘণ্টা চলাচলের পরেই পূণর্বাশনকৃত ৩টি নৌযানই বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে সবগুলো নৌযানেই হাইড্রোলিক গীয়ারের পরিবর্তে মেকানিক্যাল গীয়ার সংযোজন সহ আরেক দফা পুনর্বাসন শেষে চালু করা হয়। ২০০২ সালে পিএস টার্ন জাহাজটিতেও বেলজীয় এবিসি ইঞ্জিন সংযোজিত হয়।
সে থেকে টানা ২৫ বছর মাহসুদ সহ এসব নৌযান ঢাক,বরিশাল,খুলনা ও ঢাকা,বরিশাল,মোড়েলগঞ্জ নৌপথে যাত্রী পরিবহন করলেও দীর্ঘ অবহেলা ও উদাসীনতায় ২০২০ সালে সবগুলো প্যানেল জাহাজের মত ‘পিএস মাহসুদ কেও বসিয়ে রাখা হয়।
এ সব নৌযান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে ইউনেস্কোর মাধ্যমে বিশ ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণার সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করছেন একাধিক ইতিহাসবিদ।
পিএস মাহসুদ গত ২১ নভেম্বর থেকে ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল নৌপথে পর্যটক সার্ভিস হিসেবে চলাচল শুরুর কথা থাকলেও পরে তা ২৮ নভেম্বর বাণিজ্যিক পরিচলনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বরিশাল বন্দরে এ নৌযানটি ভেড়ার মত কোন ঘাট একনো প্রস্তুত হয়নি ফলে প্রথম দিনে যাত্রীদের খাদ্য বিভাগের সিএসডি সংলগ্ন ৩০ গোডাউন ঘাটে ভেড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে বরিশাল বন্দরের মূল টার্মিনালে ৬টি পন্টুন থাকলেও বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইডিব্লিউটিএ-র মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছেনা বলে জানা গেছে। ফলে প্রথম ট্রিপেই যাত্রীরা চরম বিড়ম্বনায় পড়তে যাচ্ছে। খাদ্য বিভাগের ঐ কার্গো ঘাটে কোন যানবাহন থাকে না বিধায় সেখানে অবতরণ করে যাত্রীরা চরম বিড়ম্বনার শিকার হবারও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ওয়াকিবহাল মহল।
নৌযানটির বাতানুকল প্রথম শ্রেণিতে জনপ্রতি ভাড়া ২৬শ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১,৬৫০ টাকা এবং ডেক শ্রেণিতে ৬শ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। সংস্থাটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পিএস মাহসুদ প্রতি শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা থেকে এবং প্রতি শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় বরিশাল থেকে যাত্রা করবে।
তবে পিএস মাহসুদ ও বেসরকারি খাতে ইজারা প্রদানের মাধ্যমে পর্যটক সার্ভিস হিসেবে চালানোর লক্ষ্যেইতোমধ্যে দরপত্র অঅহবান করার হয়েছে বলেও জানা গেছে।
তবে সংস্থাটির হাতে থাকা ৪টি নৌযানের মধ্যে পিএস অস্ট্রিচ বিবেকহীনভাবে বিনা দরপত্রে ইজারা দেয়া হয় বিগত সরকারের নৌ পরিবহন মন্ত্রীর নির্দেশে। ইজারাদার নৌযানটির উপরিকাঠামোর প্রায় পুরোটাই ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। এমনকি নির্ধারিত ভাড়াও পরিরেশাধ করেনি, দীর্ঘদিন ইজারাদারের হাতে আটক থাকার পরে শেষ পর্যন্ত ম্যজিষ্ট্রেট ও পুলিশ নিয়ে নৌযানটি উদ্ধার করতে হয়েছে। বকেয়া আদায়ে আদালতে মামলা চললেও নৌযানটি পুনরায় ইজারা প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এমনকি যে ইজারাদার নৌযানটির ব্যাপক ক্ষতিসাধন সহ ভাড়া পরিষোধ করেনি। তারাও পুনরায় অষ্ট্রিচ কে ভাড়া নেয়ার তদবির শুরু করেছে বলে জানা গেছে। তবে পিএস অস্ট্রিচ সহ সবগুলো প্যানেল নৌযানই ঐতিহ্য হিসেব সংরক্ষণ করা হবে,বলে নৌ পরিবহন উপদেষ্টা প্রধান উপদেষ্টার সামনে ঘোষণা করেছেন।